আওয়ার টাইমস নিউজ।
সম্পাদকীয় কলামঃ একটি জাতির প্রকৃত সমৃদ্ধি কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং পরিমাপ করা হয় সেই জাতির জ্ঞানভিত্তিক সম্পদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষ এবং নৈতিক গুণসম্পন্ন ‘সূর্যসন্তানদের’ দিয়ে। চিকিৎসাসেবা যখন বিশ্বজুড়ে কেবলই এক যান্ত্রিক পেশা বা করপোরেট ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই আমাদের এই বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া একজন সোনার মানুষ, যিনি তার মেধা, সততা এবং নিখাদ দেশপ্রেমের এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্নায়ুরোগ (নিউরোলজি) জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ।
আমি একজন ক্ষুদ্র লেখক হিসেবে অত্যন্ত গর্ব ও গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং কৃতজ্ঞচিত্তে এই মহান গুণী মানুষকে সমগ্র বাঙালি জাতির সামনে তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় ও মানবিক মর্যাদায় উপস্থাপন করছি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নিরাময় বা শিফা দেওয়ার একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তবে এই পৃথিবীতে মানুষের তীব্র শারীরিক ও মানসিক কষ্ট লাঘবের জন্য তিনি কিছু মানুষকে অসাধারণ প্রজ্ঞা, গভীর জ্ঞান ও মমতার উসিলা হিসেবে নিয়োজিত করেন। অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ নিঃসন্দেহে সেই পবিত্র উসিলাদের একজন। এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর নিউরোলজির মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়ে ওনার উচ্চতর এমডি (নিউরোলজি) এবং এফসিপিএস (নিউরোলজি) ডিগ্রি, পাশাপাশি এই বিশেষায়িত ক্ষেত্রে ওনার উচ্চতর ফেলোশিপ ওনার জ্ঞান ও দক্ষতাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র এশিয়া মহাদেশে স্নায়ুরোগ চিকিৎসায় ওনার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং নিখুঁত ‘ক্লিনিক্যাল ডায়াগনস্টিক স্কিল’ সমকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক পরম বিস্ময়। কিন্তু ওনার মেধার চেয়েও যে বিষয়টি ওনাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা হলো ওনার অসাধারণ বিনয়, পরম ধার্মিকতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ।
এই গুণী মানুষটি কেবল চেম্বারে বসে রোগী দেখেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং এ দেশের সাধারণ, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। সরকারি পর্যায়ে মাত্র নামমাত্র মূল্যে বিশ্বমানের নিউরো চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকার অন্যতম প্রধান নিউরোলজিক্যাল প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল’-এ তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক সফল প্রিন্সিপাল হিসেবে তিনি এ দেশে তৈরি করেছেন একঝাঁক আন্তর্জাতিক মানের তরুণ চিকিৎসক ও নিউরোলজিস্ট। একই সাথে, ঢাকার ইস্কাটন রোডে সুবিধাজনক অবস্থানে অবস্থিত ওনার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘এসপিআরসি অ্যান্ড নিউরোলজি হসপিটাল’ আজ দেশের চিকিৎসাসেবার অন্যতম বিশ্বস্ত, আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা ঢাকার নিউরোলজিক্যাল রোগীদের জন্য এক পরম আশীর্বাদ ও অমূল্য সম্পদস্বরূপ।
স্ট্রোক, মাইগ্রেন, এপিলেপসি (মৃগী রোগ), পারকিনসন্স ডিজিজ কিংবা মাল্টিপল স্কেলেরোসিসের মতো স্নায়ুতন্ত্রের চরম জটিল ও ভয়ংকর ব্যাধিতে আক্রান্ত দিশেহারা রোগীরা যখন ওনার শরণাপন্ন হন, তখন ওনার উন্নত ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি ও সর্বাধুনিক চিকিৎসা প্রয়োগ নতুন জীবনের আলো দেখায়। ওনার চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ‘রোগী-কেন্দ্রিক’, যেখানে তিনি প্রতিটি রোগীর অবস্থা গভীরভাবে অনুধাবন করে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় ওষুধ তাঁর প্রেসক্রিপশন নয়, বরং তাঁর ব্যবহার ও রোগীর স্বজনদের দেওয়া মানসিক অভয়। ওনার সান্নিধ্যে আসা প্রতিটি মানুষ একবাক্যে স্বীকার করেন, মস্তিস্কের জটিল রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীর ফাইল যখন তিনি পরম যত্নে দেখেন এবং অভিভাবকের মতো সান্ত্বনা দেন, তখন নিরাশ হৃদয়েও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বেঁচে থাকার নতুন শক্তি জ্বলে ওঠে।
আমরা মনে করছি, অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ কেবল একজন ব্যক্তি, অধ্যাপক বা নামী চিকিৎসক নন; তিনি আমাদের রাষ্ট্রীয় গৌরব এবং সমগ্র বাঙালি জাতির এক অমূল্য সম্পদ। এই ধরনের সূর্যসন্তানদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পরম যত্ন করা রাষ্ট্র ও সাধারণ সমাজ-উভয়েরই এক পরম নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমান যুগে যেখানে অর্থ ও মোহের টানে ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের হিড়িক চলছে, সেখানে এই কিংবদন্তি চিকিৎসক নিজের সমস্ত জীবন, মেধা ও যৌবনকে এই মাতৃভূমির কল্যাণে এবং দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে উজাড় করে দিয়েছেন।
আমরা মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে এই দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী শিক্ষক ও মানবতার সেবকের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান-আসুন, আমরা আমাদের এই জীবন্ত জাতীয় সম্পদকে পরম শ্রদ্ধায় আগলে রাখি, ওনার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করি এবং ওনার জন্য সবসময় অন্তরের গভীর থেকে দোয়া করি। তিনি বেঁচে থাকুন লাখো অসহায় পরিবারের আশার প্রদীপ হয়ে, তাঁর হাত ধরে সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্র।
বিশিষ্ট লেখক গবেষকঃ হুসাইন আল আজাদ ইবনে নোয়াব
চেয়ারম্যানঃ এমকিউ গ্লোবাল ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
প্রধান সম্পাদকঃ আওয়ার টাইমস নিউজ।