আওয়ার টাইমস নিউজ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান বর্তমানে এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার নজিরবিহীন দরপতন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ চলছে। এই বিক্ষোভ এখন শুধু রাস্তায় সীমাবদ্ধ নেই, সরকারি স্থাপনাকেও লক্ষ্য করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ ইরানের ফারস প্রদেশের ফাসা শহরে বুধবার একদল বিক্ষোভকারী স্থানীয় গভর্নরেট ভবনে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা ভবনের প্রধান ফটক ভাঙার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এবং ভবনে ঢোকার সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিতে দিতে ভবনের ফটকের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সংঘর্ষের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত তিন সদস্য আহত হন। একই সঙ্গে চারজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ২৮ বছর বয়সী এক নারীও রয়েছেন। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, আটক ও দমনমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এই আন্দোলনের সূচনা হয় গত রোববার রাজধানী তেহরানে। প্রথমে দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের ভয়াবহ দরপতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। পরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্যান্য শহরে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের পাশাপাশি ইসফাহান, ইয়াজদ ও জানজান শহরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিক্ষোভের মধ্যেই বুধবার তেহরানে এক ব্যবসায়িক সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি অভিযোগ করেন, এই পরিস্থিতিকে ঘিরে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকদের অধিকার হলেও সহিংসতা বা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরান এখন চরম চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানি রিয়ালের মান দ্রুত কমে গেছে। বিক্ষোভ শুরুর সময় এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ২০ হাজার, যেখানে এক বছর আগে এই হার ছিল প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার। দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নতুন চাপ দেশটির অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। বর্তমানে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে অর্থনৈতিক দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নিতে পারে, যা ইরানের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা