আওয়ার টাইমস নিউজ।
অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের বস্ত্রশিল্প আজ এক গভীর সংকটের মুখে। ভারত থেকে সস্তা দামে আসা সুতা ও নিম্নমানের কাপড়ের আগ্রাসী প্রবেশে ঝুঁকিতে পড়েছে এই খাতে বিনিয়োগ করা প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, এখনই কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত না এলে দেশীয় বস্ত্রকলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো রপ্তানি খাতে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে ভারত থেকে সুতা ও কাপড় আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বলছে, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ আসে ভারত থেকে। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় সুতাকলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত পড়ে আছে।
প্রাইস ডাম্পিংয়ে বাজার দখলের অভিযোগ
বস্ত্রখাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, ভারত সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা ও ভর্তুকির মাধ্যমে সুতা রপ্তানিকে উৎসাহিত করছে। ফলে বাংলাদেশে ভারতীয় সুতা প্রবেশ করছে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে, যাকে শিল্প সংশ্লিষ্টরা ‘প্রাইস ডাম্পিং’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। বর্তমানে যেখানে দেশীয় মিলগুলোর উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে বেশি, সেখানে ভারতীয় সুতা বাজারে তুলনামূলক অনেক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।
বিটিএমএর তথ্যমতে, স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয় যেখানে কেজিপ্রতি গড়ে ২ দশমিক ৩৯ ডলার, সেখানে ভারতীয় সুতা পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২ দশমিক ১৯ ডলারে। এই দামের ব্যবধানের কারণে পোশাকশিল্প মালিকরা বাধ্য হচ্ছেন আমদানিকৃত সুতার দিকে ঝুঁকতে।
বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মিল, আসছে না নতুন বিনিয়োগ
বিটিএমএ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে শতাধিক স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং কারখানা কার্যত সংকটে রয়েছে। গত কয়েক বছরে নতুন কোনো বড় বিনিয়োগ না আসার পাশাপাশি ৩০টির বেশি বস্ত্রকল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মিল অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে।
শিল্প মালিকদের মতে, এই প্রবণতা চলতে থাকলে শুধু বস্ত্রখাত নয়, তৈরি পোশাক শিল্পও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদন ধ্বংস হয়ে গেলে পুরো শিল্প আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে।
মান নিয়েও উদ্বেগ
খাতসংশ্লিষ্টদের আরেকটি বড় উদ্বেগ ভারতীয় সুতার মান নিয়ে। তাদের দাবি, ভারত থেকে আসা কিছু নিম্নমানের সুতায় তৈরি কাপড় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে সস্তা সুতা পোশাক কারখানার জন্য সুবিধাজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশীয় শিল্প কাঠামোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
নীতিগত সহায়তার দাবি
বস্ত্রখাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সরকারের কাছে দ্রুত নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে,
প্রাইস ডাম্পিং রোধে কার্যকর ব্যবস্থা,
দেশীয় বস্ত্রকলের জন্য আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনা,
আমদানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি,
ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো,
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পখাত এক ভয়াবহ সংকটে পড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, আজ যদি দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে আগামী দিনে দেশের শিল্পখাত আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বিদেশি কাঁচামালের ওপর, যার মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে।