আওয়ার টাইমস নিউজ।
স্পোর্টস ডেস্ক: ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই একের পর এক নজিরবিহীন বিতর্ক প্রশ্ন তুলেছে রেফারিং, ভিএআর (VAR) এবং বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে। মাঠের ভেতরে ও বাইরে লাখো সমর্থকের ক্ষোভ আজ স্পষ্ট, যেখানে ফুটবলকে বলা হয় সম্প্রীতির খেলা, সেখানে বারবার কিছু নির্দিষ্ট দেশের প্রতি ফিফার পক্ষপাতমূলক আচরণ একে কলঙ্কিত করছে। বিশেষ করে মুসলিম প্রধান দেশ ইরান, সেনেগাল এবং সর্বশেষ মিশরের ম্যাচে রেফারিংয়ের নামে যে প্রহসন মঞ্চস্থ হলো, তা বিশ্ব ক্রীড়ামোদীদের গভীরভাবে স্তম্ভিত করেছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে মিশর ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার শেষ ষোলোর ম্যাচটি। খেলার ৮০ মিনিট পর্যন্ত বুক চিতিয়ে লড়াই করে এগিয়ে ছিল মিশর। কিন্তু ম্যাচের শেষভাগে যা ঘটল, তা ৎএক কথায় 'দিনের আলোতে ডাকাতি। এই কথাটি সাধারণ কোন ফুটবলপ্রেমী বলেননি, বরং এটি বলেছেন ফুটবল বিশ্বের জনপ্রিয় বিখ্যাত কোচ হোসে মরিনিয়ো, তিনি কোন মিশরীয় নয় এবং মিশরীয় দলের কোচ নয় , বরং তিনি নিরপেক্ষ জায়গা থেকে এমন মন্তব্য করেছেন।
ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিশরের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে একের পর এক অহেতুক ফাউলের বাঁশি বাজানো, আর মিশরের পক্ষে নিশ্চিত পেনাল্টির জোরালো দাবিকে কথিত রেফারির বুড়ো আঙুল দেখানো, সবমিলিয়ে মাঠে এক আতঙ্ক ও চরম বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি করা হয়। ফলশ্রুতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মিশরকে শেষ মুহূর্তে তিনটি গোল হজম করতে হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক রেফারিং নিয়ে আজ বিশ্বের তাবড় তাবড় কিংবদন্তি ও ফুটবল বিশ্লেষকেরা মুখ খুলছেন। তারা স্পষ্ট বলছেন, মিশরকে ফুটবলীয় শক্তিতে নয়, বরং রেফারির পক্ষপাতিত্বের চক্রান্তে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে ভিএআর ও রেফারির এসব রহস্যজনক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমর্থক থেকে শুরু করে সাবেক খেলোয়াড়দের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মিশরের কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে প্রকাশ্যে এই অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। খেলোয়াড়দের চোখে-মুখে ছিল স্পষ্ট বঞ্চনার চাপ। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত দাবি করছেন, একই ধরনের ফাউল বা অপরাধের জন্য দুই দলের ক্ষেত্রে দুই ধরনের মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফিফার ‘ফেয়ার প্লে’ নীতিমালার মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেয়।
এই ঘটনা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে সেনেগালের ম্যাচেও শেষ মুহূর্তের এক বিতর্কিত পেনাল্টি দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, যাকে সাবেক ফুটবলাররা 'অতিরিক্ত কঠোর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ইরানের ম্যাচেও বারবার একই ধরনের বৈষম্যমূলক রেফারিংয়ের শিকার হতে হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা দেখে আজ বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ ধারণাই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে বিশেষ কিছু অঞ্চলের বা মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে ফিফার রেফারিদের হাত কাঁপে না।
আর্জেন্টিনার সমর্থকসহ বহু সাধারণ ফুটবলপ্রেমীও আজ এই নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশ্বখ্যাত কোচ জোসে মরিনহো থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিশ্লেষকরা ভিএআরের অপব্যবহার নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। কারণ ফুটবলের আসল সৌন্দর্যই নষ্ট হয়ে যায় যখন রেফারিরা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের মূল কারিগর হয়ে ওঠেন।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কোটি কোটি মানুষের আস্থা। কিন্তু আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তীব্র ক্ষোভ ও গণবিস্ফোরণ দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কোনো একটি ম্যাচের জয়-পরাজয় নিয়ে নয়; বরং তা ফুটবলের মৌলিক ন্যায়বিচার ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে।
ফিফা আজ এক বিরাট কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। প্রতিটি বিতর্কের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, রেফারিংয়ের মানোন্নয়ন এবং ভিএআর ব্যবহারে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব ছিল। কোনো দল বা দেশ যেন কখনো মনে না করে যে তারা বর্ণ, ধর্ম বা অঞ্চলের কারণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, এটাই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক ফুটবলের মূল লক্ষ্য।
ফুটবলকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি বা বিতর্কের আখড়া নয়, বরং ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রতীক হিসেবেই দেখতে চায় বিশ্ব। ফিফা যদি অবিলম্বে এই সমালোচনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করে এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর স্বাধীন পর্যালোচনা না করে, তবে ফুটবলের মর্যাদা চিরতরে ভূলুণ্ঠিত হবে। কারণ ফুটবলের আসল বিজয় তখনই, যখন পরাজিত দলও বিশ্বাস করে যে তারা একটি ন্যায্য ও সৎ লড়াইয়ে হেরেছে, চক্রান্তের শিকার হয়ে নয়।
লেখকঃ হুসাইন ইবনে নোয়াব
লেখক গবেষক স্পোর্টস বিশ্লেষক