আওয়ার টাইমস নিউজ।
ইসলামী ডেস্ক: রমজান মাসের শেষ দশক মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত বরকতময় সময়। এই সময়ের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাত হলো লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন—
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
অর্থ: “কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”
(সূরা কদর: ৩)
এই রাতেই কোরআন অবতীর্ণ হয় এবং আল্লাহর নির্দেশে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। ফজর পর্যন্ত এ রাত শান্তি ও রহমতে পরিপূর্ণ থাকে।
নবী করিম ﷺ রমজানের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে ইবাদতে মনোযোগ দিতেন। হাদিসে এসেছে—
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থ: যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করে, তার পূর্বের গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
(সহিহ বুখারি)
তাই একজন মুমিনের উচিত এই রাতগুলোকে যথাসম্ভব ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানো। নিচে এমন কিছু আমল তুলে ধরা হলো, যা এই রাতগুলোতে বিশেষভাবে করা যেতে পারে।
১. নফল নামাজ আদায়
কদরের রাতে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। নবী ﷺ রমজানের শেষ দশকে রাত জেগে দীর্ঘ সময় নামাজ আদায় করতেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْتَهِدُ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لا يَجْتَهِدُ فِي غَيْرِهِ
অর্থ: রাসুলুল্লাহ ﷺ রমজানের শেষ দশকে ইবাদতে এত বেশি পরিশ্রম করতেন, যা অন্য সময় করতেন না।
(সহিহ মুসলিম)
২. আওয়াবিন নামাজ
মাগরিবের নামাজের পর ছয় রাকাত নফল নামাজকে আওয়াবিন বলা হয়। এটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
হাদিসে এসেছে—
مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ سِتَّ رَكَعَاتٍ لَمْ يَتَكَلَّمْ بَيْنَهُنَّ بِسُوءٍ عُدِلْنَ لَهُ بِعِبَادَةِ اثْنَتَيْ عَشْرَةَ سَنَةً
অর্থ: যে ব্যক্তি মাগরিবের পরে ছয় রাকাত নামাজ পড়বে এবং এর মাঝে কোনো অশোভন কথা বলবে না, তাকে বারো বছরের ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব দেওয়া হবে।
(ইবনে মাজাহ)
৩. তাহাজ্জুদ নামাজ
রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
হাদিসে বলা হয়েছে—
أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ
অর্থ: ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।
(সহিহ মুসলিম)
রমজানের শেষ রাতগুলোতে এই নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সালাতুত তাসবিহ
চার রাকাতের একটি বিশেষ নফল নামাজ হলো সালাতুত তাসবিহ। এতে নির্দিষ্ট তাসবিহ বারবার পাঠ করা হয়।
হাদিসে উল্লেখ আছে—
يَا عَبَّاسُ أَلَا أُعْطِيكَ أَلَا أَمْنَحُكَ ... صَلِّ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ تَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَسُورَةٍ
অর্থ: নবী ﷺ তার চাচা আব্বাস (রা.)-কে এই নামাজের শিক্ষা দেন এবং বলেন এটি গোনাহ মাফের একটি মাধ্যম।
(আবু দাউদ)
৫. কোরআন তিলাওয়াত
লাইলাতুল কদর সেই রাত, যেদিন কোরআন নাজিল হয়। তাই এই রাতে কোরআন তিলাওয়াত করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত করা এবং এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা একজন মুমিনের জন্য বড় সৌভাগ্যের বিষয়।
৬. বেশি বেশি দোয়া করা
এই রাতে বিশেষ একটি দোয়া পড়তে নবী ﷺ উৎসাহ দিয়েছেন।
দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আননি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।
(তিরমিজি)
৭. দরুদ শরিফ পাঠ
নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ বান্দার ওপর রহমত বর্ষণ করেন।
হাদিসে এসেছে—
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا
অর্থ: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন।
(সহিহ মুসলিম)
৮. তওবা ও ইস্তেগফার
মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তবে আন্তরিকভাবে তওবা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ: يَا ابْنَ آدَمَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ
অর্থ: হে আদম সন্তান, যতক্ষণ তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাইবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব।
(তিরমিজি)
৯. জিকির-আজকার
আল্লাহকে স্মরণ করা মুমিনের অন্যতম ইবাদত। জিকিরের মাধ্যমে হৃদয় প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
কোরআনে বলা হয়েছে—
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ
অর্থ: তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।
(সূরা বাকারা: ১৫২)
১০. অন্যদের জন্য দোয়া
নিজের পাশাপাশি অন্যদের জন্য দোয়া করা ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ। হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ তার ভাইয়ের জন্য অগোচরে দোয়া করলে ফেরেশতারা তার জন্যও একই দোয়া করেন।
এই বরকতময় রাতে বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা উত্তম।