আওয়ার টাইমস নিউজ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা কার্যত এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই দীর্ঘমেয়াদি হামলায় উপত্যকাজুড়ে প্রায় ৬ কোটি টন ধ্বংসাবশেষ জমে উঠেছে, যা অপসারণ করতে সময় লাগতে পারে সাত বছরেরও বেশি।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি ও সংস্থাটির প্রজেক্ট সার্ভিস অফিস (UNOPS) এর নির্বাহী পরিচালক জর্জ মোরেইরা দ্য সিলভা বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান। সম্প্রতি গাজা সফর শেষে তিনি বলেন, সেখানে মানবিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
তার ভাষায়, আমি মাত্র গাজা থেকে ফিরেছি। মানুষ সম্পূর্ণভাবে ক্লান্ত, আতঙ্কিত এবং অসহনীয় মানসিক চাপে রয়েছে। তার ওপর তীব্র শীত ও ভারী বৃষ্টি তাদের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি জানান, গাজায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ পরিবহনের জন্য অন্তত তিন হাজার কনটেইনার জাহাজ প্রয়োজন হবে। গড় হিসাবে উপত্যকার প্রতিটি বাসিন্দার আশপাশে প্রায় ৩০ টন ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। শুধু এই ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করতেই দীর্ঘ সময় ও বিপুল আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হবে।
এদিকে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও গাজায় হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শুক্রবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে এক বৃদ্ধা নিহত হন। একই দিনে উত্তর গাজার বাইত লাহিয়ায় ড্রোন হামলায় প্রাণ হারায় ১০ বছর বয়সি এক কন্যাশিশু।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও দুইটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির সময়কালেই এখন পর্যন্ত ৪৬৩ জন নিহত, ১ হাজার ২৬৯ জন আহত এবং ৭১২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা আগ্রাসনে গাজায় মোট ৭১ হাজার ৪৫৫ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৭ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গাজা নিয়ে শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুদ্ধপরবর্তী গাজার প্রশাসন ও তদারকির জন্য একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক কমিটির অধীনে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই বোর্ডের সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্য এক পোস্টে ট্রাম্প ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে অবিলম্বে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, হামাসের উচিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে দ্রুত নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন করা এবং ইসরাইলে বাকি মরদেহ হস্তান্তর করা।
যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে গাজা থেকে জীবিত সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো একজন জিম্মির মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে। এদিকে, ফিলিস্তিনি পক্ষের অভিযোগ, ইসরাইল যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী হামলা পুরোপুরি বন্ধ করেনি এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা প্রবেশেও বাধা দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর নিরস্ত্রীকরণের দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে গাজা ইসরাইলি দখল ও সামরিক চাপের মধ্যে থাকায় অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামীরা।
গাজায় জমে ওঠা এই বিপুল ধ্বংসস্তূপ শুধু পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জই নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ের এক ভয়াবহ প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।