আওয়ার টাইমস নিউজ।
ইসলামি জীবন ডেস্ক: কখনো কখনো সত্য এমনভাবে দরজায় কড়া নাড়ে, যে মানুষ নিজেও বুঝে উঠতে পারে না-সে কাঁদছে কেন। শুধু মনে হয়, বুকের ভেতর কোথাও গভীর থেকে কিছু একটা ভেঙে পড়ছে, আবার নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। এমনই এক সত্যের গল্প এই পৃথিবীকে কাঁদিয়েছে। কাঁদিয়েছে কোটি হৃদয়।
সেই গল্প একজন মার্কিন খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারক নারীর-আমিনা এসলিমির। আমিনা এসলিমি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত মার্কিন সাংবাদিক। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন কঠোর খ্রিষ্টান এবং সক্রিয় খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারক। তার বিশ্বাস ছিল অটল-খ্রিষ্ট ধর্মই একমাত্র সত্য, আর ইসলাম একটি মানবসৃষ্ট ভ্রান্ত বিশ্বাস। মুসলমানদের তিনি দেখতেন অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ হিসেবে। ইসলামের নাম শুনলেই তার মনে জন্ম নিত ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা।
কিন্তু আল্লাহ যখন কাউকে হেদায়াত দিতে চান, তখন সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকেই শুরু হয় সেই যাত্রা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন টার্মে ভর্তি হতে গিয়ে কম্পিউটারের একটি সামান্য ভুল তার জীবনকে উল্টে দেয়। অজান্তেই তিনি ভর্তি হয়ে যান এমন একটি ক্লাসে, যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আরব মুসলমান। সফরে থাকার কারণে প্রথমে বিষয়টি বুঝতেও পারেননি। পরে জানতে পারেন, ক্লাস পরিবর্তনের আর কোনো সুযোগ নেই।
মুসলমানদের সঙ্গে এক ক্লাসে বসার চিন্তাই তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। কিন্তু তার স্বামী তখন বলেন,
“হয়তো ঈশ্বর তোমাকে এখানেই পাঠিয়েছেন, মুসলমানদের মাঝে খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের জন্য।”
এই কথাই তার মনে নতুন সংকল্প জাগিয়ে তোলে। খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি সেই ক্লাসে যাওয়া শুরু করেন। মুসলমান সহপাঠীদের কাছে নানা অজুহাতে ঈসা মাসীহের অনুসরণের আহ্বান জানাতেন। বলতেন, মুক্তি কেবল তাঁর মাধ্যমেই সম্ভব।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, মুসলমান শিক্ষার্থীরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হয়নি, বিদ্রূপ করেনি। তারা ধৈর্য ও সম্মানের সঙ্গে সব শুনেছে। এই আচরণ তাকে আরও অস্থির করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন, “মুসলমানদের বই দিয়েই আমি প্রমাণ করব, ইসলাম একটি মিথ্যা ধর্ম।” এই উদ্দেশ্যে তিনি সংগ্রহ করেন পবিত্র কুরআন ও কয়েকটি ইসলামী বই। শুরু হয় এমন এক পড়াশোনা, যা তিনি নিজেও কল্পনা করেননি।
কুরআনের আয়াত পড়তে পড়তে তার হৃদয়ে অদ্ভুত এক আলো নেমে আসে। যে ধর্মকে তিনি ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলেন, সেই ধর্মই ধীরে ধীরে তার আত্মাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। দেড় বছরের মধ্যে তিনি কুরআন দুইবার পড়েন এবং পনেরটিরও বেশি ইসলামী বই অধ্যয়ন করেন।
এই সময় তার জীবন বদলে যেতে থাকে। তিনি মদ্যপান ছেড়ে দেন। শূকরের মাংস ত্যাগ করেন। অশ্লীল পার্টি ও অবাধ মেলামেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। নিজেই অবাক হয়ে বলেন, “আমি ভাবিনি ইসলাম নিয়ে পড়তে গিয়ে আমার জীবন এভাবে পাল্টে যাবে।” তবুও তখনও নিজেকে খ্রিষ্টানই ভাবতেন তিনি। একদিন মুসলমানদের সঙ্গে এক গভীর সংলাপে তিনি যত প্রশ্ন ছুড়েছেন, তারা তত শান্ত ও প্রজ্ঞার সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন। তার আক্রমণাত্মক মন্তব্যেও তারা রাগ করেননি। বলেছিলেন, “জ্ঞান মুসলমানের হারানো সম্পদ। প্রশ্ন করা জ্ঞান অর্জনের পথ।” সেদিন তারা চলে যাওয়ার পর আমিনা অনুভব করেন, তার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেছে।
সেই ভাঙনের মধ্যেই জন্ম নিচ্ছিল সত্য, একদিন অবশেষে তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।” ইসলাম গ্রহণের পর শুরু হয় কঠিন পরীক্ষা। হিজাব গ্রহণ করেন তিনি। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। সন্তানদের অধিকার নিয়ে মামলা গড়ায় আদালতে।
একজন বিচারক তাকে প্রশ্ন করেন “তোমার সন্তান, না ইসলাম একটি বেছে নাও।” এই প্রশ্ন শুনে যে কোনো মায়ের হৃদয় ভেঙে যায়। চোখের পানি চেপে রেখে, বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে তিনি আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন। কুরআনে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের কথা তাকে শক্তি দেয়।
দীর্ঘ পরীক্ষার পর আল্লাহ তাকে বিজয় দেন। সন্তানরা ফিরে আসে। পরিবার একে একে ইসলামের আলো গ্রহণ করে। এমনকি একদিন যিনি তাকে ত্যাগ করেছিলেন, সেই সাবেক স্বামীও ক্ষমা চান।
আজ আমিনা এসলিমি একজন বিশ্ব মুসলিম নারী নেত্রী। তার কণ্ঠে যখন ইসলাম নিয়ে কথা উঠে আসে, তখন অসংখ্য মানুষ কেঁদে ফেলে। কারণ তার গল্প শুধু ইসলাম গ্রহণের গল্প নয়, এটা সত্যের কাছে আত্মসমর্পণের গল্প।
সূত্রঃ ইংলিশ ব্লগ