কয় শ্রেণীর মানুষকে যাকাত দেওয়া যাবে?

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।

আট শ্রেণীর মানুষকে যাকাত দেওয়া যাবে।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্য থেকে একটি হলো যাকাত। যাকাত আদায় করা ইসলামের একটি ফরজ বিধান, কেউ যদি যাকাত আদায় না করে তাহলে সে গুনাহগার হবে। ফরজ পরিত্যাগকারী হিসেবে গণনা করা হবে। আর কেউ যদি যাকাতের বিধানকে অস্বীকার করে তাহলে সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। কেননা কেউ যদি ইসলামের ফরজ বিধানকে অস্বীকার করে তাহলে সে কাফের হয়ে যায়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন।
الَّذِیۡنَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ ہُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ

অনুবাদঃ
যারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে আর তারা আখিরাতে বিশ্বাসী। -(সূরা ২৭. আন-নামাল আয়াত নং ৩)

এ আয়াত দ্বারা আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, যারা নামায কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে তারা বিশ্বাসী। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশ্বাস করে। আল্লাহর সমস্ত বিধানকে মেনে নিয়ে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে গ্রহণ করে রাসূলকে বিশ্বাস করেছে।

ইবনে কাসির এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন-
কুরআন মজীদের এ আয়াতগুলো কেবলমাত্র এমনসব লোকদেরই পথনির্দেশনা দেয় এবং শুভ পরিণামের সুসংবাদও একমাত্র এমনসব লোকদের দান করে যাদের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী পাওয়া যায়। একটি হচ্ছে, তারা ঈমান আনে এবং সে ঈমান অনুসারে আমল করে। ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে তারা কুরআন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত গ্রহণ করে। এক আল্লাহকে নিজেদের একমাত্র উপাস্য ও রব বলে মেনে নেয়। কুরআনকে আল্লাহর কিতাব হিসেবে স্বীকার করে নেয়।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য নবী বলে গ্রহণ করে। আর আমল করার অর্থ হচ্ছে, তারা এ বিষয়গুলো কেবলমাত্র মেনে নিয়েই বসে থাকে না বরং কার্যত এগুলোর অনুসরণ ও আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ হয়। তাই তারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়। দ্বিতীয় গুণটি হচ্ছে, তারা ঈমান রাখে যে, এ জীবনের পর দ্বিতীয় আর একটি জীবন আছে, সেখানে আমাদের নিজেদের কাজের হিসেব দিতে এবং প্রত্যেকটি কাজের প্রতিদান লাভ করতে হবে। এ দু’টি শর্ত যারা পূর্ণ করবে। কুরআন মজীদের আয়াত তাদেরকেই দুনিয়ায় সত্য সরল পথের সন্ধান দেবে। [ইবন কাসীর]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয (রাঃ)-কে ইয়ামান দেশে (শাসক হিসেবে) প্রেরণ করেন। অতঃপর বললেন, সেখানকার অধিবাসীদেরকে এ সাক্ষ্য দানের প্রতি আহবান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তা মেনে নেয় তবে তাদেরকে অবগত কর যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর প্রতি দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করেছেন। যদি সেটাও তারা মেনে নেয় তবে তাদেরকে অবগত কর যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে সদাকাহ (যাকাত) ফরজ করেছেন। যেটা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রদের মাঝে প্রদান করা হবে।

যাকাত ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত করে দরিদ্রদের মাঝে প্রদান করা হয়। যাকাত ওয়াজিব পরিমাণ সম্পত্তি, টাকা-পয়সা আসবাবপত্র যার কাছে থাকবে সে তার সম্পত্তি, টাকা-পয়সা আসবাবপত্র থেকে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ গরিব-দুঃখীদেরকে প্রদান করবে। যাকাতের হক এটা গরিব-দুঃখীদের। আমাদের সম্পত্তির মাঝে গরিবদের ও একটি অংশ রয়েছে যে অংশটি গরীবদেরকে দিয়ে দিতে হয়। গরিবের অংশ গরীবের মাঝে পৌঁছে দিতে হবে নিজে ভোগ করা যাবে না।

আট শ্রেণীর ব্যক্তিকে যাকাত দেওয়া যাবে।
হাদিয়া তোহফাহ এগুলো যে কোন মানুষকে দেওয়া যায়। আপনজন পাড়া-প্রতিবেশী নিকটাত্মীয় সহ সর্বস্তরের মানুষকে দেওয়া যায়। কিন্তু যাকাতের বিষয়টি ভিন্ন আল্লাহ তাআলা যাকাতের খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। নির্দিষ্ট খাত ছাড়া অন্য কোথাও যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমের মধ্যে আটটি খাত উল্লেখ করেছেন।

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡہَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰہِ ؕ وَ اللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ﴿۶۰﴾

অনুবাদঃ
নিশ্চয় সদাকা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।
(সূরা ৯. আত-তাওবা আয়াত নং ৬০)

যাকাতের প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যয়ের খাত হলো “ফকির এবং মিসকিন”। ফকির বলা হয় যার কাছে কিছুই নেই এমনকি একদিনের খাবারওনেই। আর মিসকিন বলে ওই ব্যক্তিকে যার কাছে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পরিমাণ সম্পত্তি নেই। যদিও গরিব মিসকিন উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে কিন্তু যাকাত গ্রহণের দিক দিয়ে উভয়টি সমান। মোটকথা: যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই সেই ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করতে পারবে আর যার কাছে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা তার সমপরিমাণ অর্থ-সম্পদ থাকবে সে যাকাত খেতে পারবে না।

যাকাতের তৃতীয় ব্যয়ের খাত হলো “আমিলিনে সদকা” অর্থাৎ যাকাত উত্তোলনকারী কর্মী।
ইসলামী খেলাফতের রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতিতে সাধারণ জনগণ থেকে যাকাত আদায়কারী ব্যক্তি। যিনি জনগণের থেকে যাকাত উসুল করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

যাকাতের চতুর্থ ব্যয় খাত হল ‘মুআল্লাফাতুল কুলুব’। সাধারণত তারা তিন চার শ্রেণীর বলে উল্লেখ করা হয়। এদের কিছু মুসলিম, কিছু অমুসলিম। মুসলিমদের মধ্যে কেউ ছিল চরম অভাবগ্রস্ত এবং নওমুসলিম, এদের চিত্তাকর্ষণের ব্যবস্থা এজন্যে নেয়া হয়, যেন তাদের ইসলামী বিশ্বাস পরিপক্ক হয়। আবার কেউ কেউ ইসলামের বিধি-বিধান ওয়াজ-নসিহত যুদ্ধ-জিহাদ এগুলোর মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে না। দয়া অনুগ্রহতার মাধ্যমে বেশি প্রভাবিত হন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে প্রভাবিত করার জন্য যাকাত দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য তাদের কাছে ফুটে তুলতেন।

যাকাতের পঞ্চম ব্যয়খাত হলো, দাসমুক্তিতে যাকাতের সম্পদ ব্যয় করা। এমন দাসকে যাকাত দিতে পারবে যার মনিব তাকে টাকার বিনিময় আজাদ করে দেওয়ার কথা বলেছে আর সে টাকার না থাকায কারনে মুক্তি পাচ্ছে না। তাকে যাকাতের টাকা দিয়ে মুক্ত করতে পারবে।

যাকাতের ষষ্ট ব্যয়খাত হল “দেনাদার বা ঋণগ্রস্ত”। দেনাদারের কাছে ঋণ পরিশোধ করার পর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পরিমাণ সম্পত্তি না থাকতে হবে। ঋণ পরিশোধ করার পর যাকাত ওয়াজিব হওয়া পরিমাণ সম্পত্তি থাকলে কাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। কোন কোন ইমামগণ এই শর্ত করেছেন যে, অবৈধ কোন খাতে ঋণ না করতে হবে। অবৈধ কাজে ঋণ করে থাকলে ওই ব্যক্তিকে যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে না।

সপ্তম যাকাতের ব্যয়খাত হলোঃ “ফি সাবীলিল্লাহ”। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এর মর্ম সেসব গাযী ও মুজাহিদ, যাদের অস্ত্র ও জিহাদের উপকরণ ক্রয় করার ক্ষমতা নেই। এ জাতীয় নির্ভেজাল দ্বীনী খেদমত ও ইবাদাতের কাজেই যাকাতের মাল ব্যয় করা খুব জরুরী।

যাকাতের অষ্টম ব্যয়খাত হলো “মুসাফির”। যাকাতের ব্যয়খাতের ক্ষেত্রে এমন মুসাফির বা পথিককে বুঝানোই উদ্দেশ্য, যার কাছে সফরকালে প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পদ নেই, বাড়িতে তার যত অর্থ-সম্পদই থাক না কেন। এমন মুসাফিরকে যাকাতের মাল দেয়া যেতে পারে, যাতে করে সে তার সফরের প্রয়োজনাদি সমাধা করতে পারবে এবং স্বদেশ ফিরে যেতে সমর্থ হবে।

পূর্বে উল্লেখিত আটটি ব্যয়ের খাত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এই আটটি খাতে যাকাত আদায় করতে হবে। একটি লক্ষণীয় বিষয় হল যাকাত দেওয়ার সময় তাদেরকে পরিপূর্ণভাবে মালের মালিক বানিয়ে দিতে হবে। পরিপূর্ণভাবে মালের মালিক না বানালে যাকাত আদায় হবে না।

আল্লাহতালা আমাদের সকলকে নিজেদের সম্পত্তি থেকে গরিবের হক যাকাতকে আদায় করার তৌফিক দান করুন, আমীন। লেখক: মাওলানা আতাউল্লাহ্

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে