সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ কতটুকু?

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
ফিতর শব্দের অর্থ হলো রোযা ভঙ্গকরণ আর সদকাতুল ফিতর বলা হয় রমজান মাসের পরিপূর্ণ রোজা সমাপ্তির পর যেই দান দেওয়া হয় তাকে সদকাতুল ফিতর বলে।

ইসলামী শরিয়ার মধ্যে সদকাতুল ফিতর গুরুত্বপূর্ণ একটি এবাদত। রমজানের রোজা সম্পন্ন করার পর সদকাতুল ফিতর আদায় করা হয়ে থাকে। রোজা আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের যে ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে তার পরিপূরক হিসেবে সদকাতুল ফিতর আদায় করা হয়।

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنْ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنْ الصَّدَقَاتِ .

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাদার ব্যক্তিকে গরীব মিসকিনদের সহযোগিতা, অশ্লীল, অনর্থক কাজ থেকে বাঁচানোর জন্য সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব করেছেন । কেউ যদি তা নামাজের পূর্বে আদায় করে, তাহলে সেটা মকবুল সদকা হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কেউ তা নামাজের পর আদায় করে তাহলে সেটা সাধারণ দানের মত দান ধরা হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-
قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ تَزَکّٰی ﴿ۙ۱۴﴾وَ ذَکَرَ اسۡمَ رَبِّہٖ فَصَلّٰی ﴿ؕ۱۵﴾
অর্থ: অবশ্যই সাফল্য লাভ করবে যে পরিশুদ্ধ হয়। এবং তার রবের নাম স্মরণ করে ও সালাত কায়েম করে। (সূরা আলা 14-15)
এ আয়াতের পরিশুদ্ধ দ্বারা যাকাত ও উদ্দেশ্য হতে পারে কেননা যাকাত আদায় করার দ্বারা সম্পত্তি পরিশুদ্ধ এবং পবিত্র হয় । কোন কোন মুফাসসিরগণ এই ব্যাখ্যা করেছেন।

হযরত ওয়াকি ইবনে জাররাহ রাহিমাহুমুল্লাহ হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন রমজান মাসে সদকাতুল ফিতর আদায় করা নামাজের মধ্যে সিজদায় সাহু আদায় করার ন্যায়। ফিতরা রোজার ক্ষতিপূরক যেমন নাকি সিজদায়ে সাহু নামাজের ক্ষতিপূরক।

সদকায়ে ফিতর কার উপর ওয়াজিব হবে?
ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যার কাছে যাকাত ওয়াজিব হওয়া পরিমাণ অর্থাৎ অত্যাবশ্যকীয় আসবাব সামগ্রী ব্যবহার্য দ্রাব্যাদি বাসগৃহ ইত্যাদি বাদ দিয়ে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা এর সমমূল্য পরিমাণ সম্পদ থাকে তার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য থাকে যে, যাকাতের মতো এখানে এক বছর ঐ মাল অতিবাহিত হওয়া জরুরি নয়। শুধুমাত্র ঈদের দিন মালিক থাকলে ফিতরা ওয়াজিব হবে।
(দেখুন: ফতওয়ায়ে তাতার খানিয়া)

রোজা না রাখলে বা রাখতে না পারলে তার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে কিনা?
কেউ রোজা না রাখলে বা রাখতে না পারলেও তার ওপর ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। এ কথা নয় যে রোজা না রাখতে বা রাখতে না পারলে ফিতরা দিতে হবে না। রোজা আর ফিতরা ভিন্ন ভিন্ন এবাদত। কেউ যদি রোজা রাখতে না পারে অথবা না রাখে তারপরও সদকায়ে ফিতর দেওয়া ওয়াজিব। (দেখুন: ফতওয়ায়ে আলমগীরী)

সদকায়ে ফিতর কার কার পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব?

প্রত্যেকে ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে এবং পিতা হলে নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে দেওয়া ওয়াজিব। বালেগ সন্তান, স্ত্রী-স্বামী, চাকর-চাকরানী, মাতা-পিতার পক্ষ থেকে দেওয়া ওয়াজিব নয়। তবে যৌথ পরিবার হলে বালেগ সন্তান মাতা-পিতার পক্ষ থেকে স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় করে দেওয়া মুস্তাহাব। (দেখুন: ফতওয়ায় তাতার খানিয়া)

সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ কতটুকু?
এ বছর ইসলামী ফাউন্ডেশন থেকে সদকায়ে ফিতরের পরিমাণ ঘোষণা করা হয়েছে। নিম্নে উল্লেখ করা হল।

১৪৪২ হিজরী সালের সাদকাতুল ফিতর-এর হার।

(৪২ টাকা দরে) সর্বোৎকৃষ্ট গম দ্বারা আদায় করলে অর্ধ সা’ বা ১ কেজি ৬শ’ ৫০ গ্রাম বা তার বাজার মূল্য ৭০/-৳

(৪২ টাকা দরে)
সর্বোৎকৃষ্ট আটা দ্বারা আদায় করলে অর্ধ সা’ বা ১ কেজি ৬শ’ ৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৭০/-৳

(৮৪ টাকা দরে)
যব দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৮০/-৳

(৪০০ টাকা দরে)
কিসমিস দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১,৩২০/-৳

(৫০০ টাকা দরে মরিয়ম খেজুর)
খেজুর দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১,৬৫০/-৳

(৭০০ টাকা দরে)
পনির দ্বারা আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩শ’ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২,৩১০/-৳

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ থাকে যে, যারা পনির দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে সক্ষম, তারা পনির দিয়ে আদায় করবে, আর যারা খেজুর দিয়ে সম্ভব তারা খেজুর দিয়ে আর যাদের কিসমিস দিয়ে সম্ভব তারা কিসমিস দিয়ে আদায় করবে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেকে তার অর্থ অনুযায়ী সেই মানের দ্রব্য দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করবেন।

আমাদের দেশে সর্বনিম্ন পরিমাণ দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করা হয়। এটা উত্তম পন্থা নয়। বরং উত্তম হলো প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী সদকায়ে ফিতর আদায় করবে। বেশি আয়ের মানুষ উচ্চমানের খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সদকায়ে ফিতর আদায় করবে। আর মধ্যম আয়ের মানুষ মধ্যম খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করবে। আর নিম্নআয়ের ব্যক্তি কম মূল্যের খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সাদকায়ে ফিতর আদায় করবে।

ফিতরা কখন আদায় করবে?
ঈদগাহে যাওয়ার আগে দিয়ে দেওয়া উত্তম। অবশ্যই নামাজের পূর্বে দিতে না পারলে পরে দিলেও চলবে এছাড়া যদি কেউ রমজানের মধ্যে আদায় করে দেয় তাও জায়েয আছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সদকায়ে ফিতর দিয়ে গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর তৌফিক দান করুক। আমিন!
(লেখক: মাওলানা আতাউল্লাহ্ )

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে