আওয়ার টাইমস নিউজ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েলের টানা হামলায় বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ঘরবাড়ি হারিয়ে লাখো ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়েছেন অস্থায়ী শিবিরে। চারদিকে ধ্বংস, অনিশ্চয়তা আর শোকের ভারী বাতাস। কিন্তু সেই বাস্তবতার মাঝেও দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে বালুর ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক ছোট্ট বক্সিং রিং। সেখানে গ্লাভস হাতে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে কয়েকজন কিশোরী। তাদের এই লড়াই কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং ভেতরের ভয়, শোক আর মানসিক আঘাতের বিরুদ্ধে।
এই উদ্যোগের পেছনে আছেন কোচ ওসামা আইয়ুব। উত্তর গাজার গাজা সিটিতে ছিল তার একটি বক্সিং ক্লাব। ইসরায়েলি হামলায় বাড়িসহ সেই ক্লাব পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে তাকে দক্ষিণে খান ইউনিসে আশ্রয় নিতে হয়। সব হারিয়েও থেমে থাকেননি তিনি। সীমিত সামর্থ্য, অস্থায়ী পরিবেশ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সঙ্গী করে আবার শুরু করেছেন বক্সিং প্রশিক্ষণ।
বর্তমানে ৮ থেকে ১৯ বছর বয়সী কয়েকজন কিশোরী সপ্তাহে তিন দিন তার কাছে প্রশিক্ষণ নেয়। তারা কেউ বাস্তুচ্যুত, কেউ পরিবার হারিয়েছে, কেউ আবার প্রতিনিয়ত বোমাবর্ষণের ভয় নিয়ে বড় হচ্ছে। ওসামা জানান, যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এসব মেয়ের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। অনেকেই প্রিয়জন হারিয়েছে। কারও ঘর নেই, কারও নিরাপদ আশ্রয় নেই। তাদের ভেতরে জমে থাকা রাগ, কষ্ট আর হতাশা প্রকাশের একটি সুস্থ মাধ্যম দরকার ছিল। বক্সিং সেই পথ হয়ে উঠেছে।
এই প্রশিক্ষণের জন্য কোনো অর্থ নেন না ওসামা। তিনি মনে করেন, যুদ্ধের মাঝেও শিশু ও কিশোরীদের মানসিক শক্তি ধরে রাখা জরুরি। খেলাধুলা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, শৃঙ্খলা শেখায় এবং ভয়কে মোকাবিলা করতে সাহস জোগায়।
তবে এই পথ সহজ নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ক্রীড়া সরঞ্জাম পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কাঠ আর হাতের কাছে পাওয়া সামগ্রী দিয়ে অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছে রিং। নেই যথাযথ ম্যাট, নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম। তবু ঝুঁকি নিয়েই অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা। কোচ ওসামা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অন্তত প্রয়োজনীয় গ্লাভস, জুতা ও সুরক্ষা সামগ্রী পাওয়া যায়।
১৬ বছর বয়সী রিমাস জানায়, ভালো সরঞ্জাম পেলে তারা আরও ভালোভাবে অনুশীলন করতে পারবে। তার বিশ্বাস, সুযোগ পেলে তারাও বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে।
আর ১৪ বছর বয়সী গাজাল রাদওয়ানের স্বপ্ন আরও বড়। সে চায় একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে, ফিলিস্তিনের পতাকা বহন করতে। তার ভাষায়, সে বক্সিং শিখছে শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, নিজের চরিত্র গঠনের জন্য। সে একদিন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চায়।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাই জন্ম নিচ্ছে নতুন স্বপ্ন। খান ইউনিসের বালুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট রিংটি কেবল একটি খেলার জায়গা নয়। এটি যুদ্ধাহত এক প্রজন্মের মানসিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিচ্ছবি।
তথ্যসূত্র এএফপি।