আওয়ার টাইমস নিউজ।
সম্পাদকীয় কলামঃ আজ এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। এমন একটি ঘটনা, যা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
একজন ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি সন্তানের স্নেহ, ভালোবাসা এবং যত্ন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা এতটাই নির্মম হয়েছে যে, মৃত্যুর পরও কয়েকদিন ধরে তার মরদেহ ঘরের ভেতরে পড়ে ছিল। চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে, মরদেহ পচে গেছে, অথচ তারই সন্তানরা কেউ খোঁজ নেয়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই পরিবারের সদস্যরা কেউ অশিক্ষিত নন। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সমাজের চোখে তারা শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং সম্মানিত মানুষ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই কি মানুষ হওয়া যায়?
আজ এই প্রশ্নটি পুরো জাতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যেখানে একজন মানুষ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে পারে, বড় কর্মকর্তা হতে পারে, কোটি কোটি টাকার মালিক হতে পারে, কিন্তু নিজের বৃদ্ধ মায়ের খোঁজ না রাখলে সে প্রকৃত অর্থে কতটুকু মানুষ?
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন,
"তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।"
(সূরা আল-ইসরা: ২৩)
লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদার সর্বোচ্চ প্রমাণগুলোর একটি।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, "তোমার মা।" তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর কে? রাসূল (সা.) বললেন, "তোমার মা।" তৃতীয়বারও একই প্রশ্ন করলে তিনি আবার বললেন, "তোমার মা।"
চতুর্থবার তিনি বললেন,"তোমার বাবা।" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
যে ধর্ম মায়ের মর্যাদাকে তিনবার উল্লেখ করে, সেই ধর্মের অনুসারী হয়ে যদি আমরা বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করি, তাহলে আমাদের নামাজ, রোজা এবং বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় কতটুকু মূল্য বহন করবে?
আজ আমাদের সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু মানবিকতার হার কমেছে।
ডিগ্রি বেড়েছে, কিন্তু দায়িত্ববোধ কমেছে। অর্থ বেড়েছে, কিন্তু মায়ের প্রতি ভালোবাসা কমেছে। ক্যারিয়ার বেড়েছে, কিন্তু পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় সংকট। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি মানুষকে দক্ষ কর্মী বানাচ্ছে, কিন্তু মানুষ বানাতে পারছে না। একজন প্রকৌশলী সেতু নির্মাণ করতে পারেন।
একজন অধ্যাপক শত শত শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিতে পারেন।
একজন কর্মকর্তা বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু যদি তিনি নিজের বৃদ্ধ মায়ের পাশে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে তার শিক্ষা সমাজকে কতটুকু আলোকিত করতে পারবে?
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে, অথচ তাদের সেবার মাধ্যমে সে জান্নাত অর্জন করতে পারেনি।" (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস শুধু একটি উপদেশ নয়, বরং আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো একটি সতর্কবার্তা। আজ নূর জাহান বেগমের ঘটনা আমাদের সামনে একটি আয়নার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এই আয়নায় আমরা শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা দেখছি না; বরং পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের সন্তানদের শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক বা কর্মকর্তা বানালে হবে না।
তাদেরকে মানুষ বানাতে হবে। তাদেরকে শেখাতে হবে, বৃদ্ধ মা-বাবার একটি দীর্ঘশ্বাস আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাদেরকে শেখাতে হবে, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইবাদত। তাদেরকে শেখাতে হবে, জান্নাতের দরজা খুঁজতে দূরে যেতে হয় না, অনেক সময় সেই দরজা নিজের ঘরেই থাকে, মায়ের পায়ের নিচে।
আজ জাতি হিসেবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা কেমন শিক্ষা চাই? শুধু চাকরি পাওয়ার শিক্ষা? নাকি মানুষ হওয়ার শিক্ষা?
আমার বিশ্বাস, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়া শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজ প্রকৃত অর্থে মানবিক হতে পারে না। কারণ উচ্চ শিক্ষা মানুষকে বড় কর্মকর্তা বানাতে পারে, কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহ মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানায়।
লেখকঃ হুসাইন আল আজাদ ইবনে নোয়াব আলী।
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদকীয় লেখক