আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধ কি ইরানকে দুর্বল করেছে?

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
দ্বিতীয় কারাবাখ যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইরান এখন নিজের সীমান্তের উত্তরে তুরস্কের বর্ধিষ্ণু প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। এর মাধ্যমে আঙ্কারা আর্মেনীয় অঞ্চল দিয়ে একটি করিডোর অর্জন করেছে – যার মাধ্যমে তারা অবাধে ক্যাস্পিয়ান অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে। এটি ইরানের জন্যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিতে পারে।

জটিল সম্পর্ক সত্ত্বেও আজারবাইজান ইরানকে পারস্য উপসাগর থেকে বাল্টিক সাগর পর্যন্ত প্রসারিত উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডোরের জন্যে ট্রানজিট দিয়েছে। বর্ধিত সামরিক প্রভাব ছাড়াও তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ফলে বাকুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে ইরানের ক্ষমতা সীমিত করবে। তুরস্কের সাথে সুসম্পর্ক বজায়ের ক্ষেত্রে বিস্তৃত আগ্রহ নিয়ে ইরানের দ্বিধাও জটিল। তেহরানের সাথে আঙ্কারার সম্পর্ক জটিল এবং কুর্দি ইস্যু ও সিরিয়া নিয়ে দু পক্ষই সহযোগিতা এবং বিরোধিতার ভূমিকা পালন করছে।

এক রকমভাবে কারাবাখ যুদ্ধের সমাপ্তি তেহরানের জন্যে কিছু ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। সেখানকার স্থলভাগে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজিত হতে পারে। অঞ্চলটি থেকে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ ইরানের দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে উপযুক্ত। তবে এটি তুরস্ক ও রাশিয়াকে শূন্যস্থান পূরণেও উদ্বুদ্ধ করে – যা ইরানের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসলে দক্ষিণ ককেশাসের তিন দেশের সাথে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরানকে নিয়ে ছ’ দেশীয় চুক্তির জন্যে আঙ্কারার সাম্প্রতিক প্রস্তাব ভূ-রাজনৈতিক প্রবণতা পরিবর্তনের লক্ষণ – যা ইরানের পক্ষে কাজ করবে না।

ইরানের প্রতিকূল অবস্থান কূটনৈতিক ফ্রন্টে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিলো। যুদ্ধকালে দেশটির রাজনৈতিক বিষয়ক উপ-মন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি যুদ্ধ শেষ করতে সহায়তার জন্যে বাকু, মস্কো, ইয়েরেভেন ও আঙ্কারা সফর করেছিলেন। ৪ঠা নভেম্বর আরাগচির শান্তি পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছিলেন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তবে তাতে খুব বেশি প্রভাব পড়েনি। যুদ্ধরত দু পক্ষের সাথে তুরস্ক ও রাশিয়া কেউই – এ পরিকল্পনায় কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

তেহরান ১৯৯০-এর দশক থেকে যে ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে, যুদ্ধটি তা ব্যাহত করেছে। আজারবাইজান শক্তিশালী হওয়া আর আর্মেনিয়া দুর্বল হয়ে পড়ার ভয় ইরানের ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্য আর টেকসই ছিলো না। কেননা, ১৯৯৪ সালে যুদ্ধবিরতির সময় দক্ষিণ ককেশাসের ভূ-রাজনৈতিক ভূদৃশ্য এখনকার মতো ছিলো না। আজারবাইজানের সাথে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে তুরস্ক জড়িয়ে পড়ায় ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। তেল ও গ্যাসের রাজস্বে চালিত আজারবাইজানের অর্থনৈতিক শক্তিও এ পরিবর্তনগুলোতে অবদান রেখেছিলো। কারাবাখের আশপাশের স্থিতাবস্থা আর টিকিয়ে রাখা যায়নি। নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত করতে কী করা যেতে, তা নিয়ে ইরান চিন্তিত হয়ে পড়ে।

আসলে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকাতে ইরান খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। দীর্ঘকাল তুরস্ককে বিরত রাখতে মস্কো ও তেহরানকে নিশ্চিত করতে হয়েছিলো যে, হারানো অঞ্চল ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে আজারবাইজান তার সামরিক সাফল্যের জন্যে পুরস্কৃত হয়েছে। এটি যুদ্ধকালে ইরানের পরিবর্তিত বক্তৃতা ব্যাখ্যা করতে পারে। ছ’ সপ্তাহের ভেতরে তেহরান তাদের শীর্ষনেতার চার প্রতিনিধিকে উত্তরে সফর করতে পাঠিয়েছিলো এবং এ বিষয়ে জোর দিয়েছিলো যে, নাগোর্নো-কারাবাখ আজারবাইজানের অংশ এবং অধিকৃত অঞ্চলটি মুক্ত করতে ইসলামী আইনের অধীনে বাকুর সব অধিকার রয়েছে।

তুর্কি ফ্যাক্টারের বাইরেও রয়েছে রুশ ফ্যাক্টর। প্রায় ২ হাজার রুশ শান্তিরক্ষী এখন নাগোর্নো-কারাবাখে রয়েছে। ইরানের সীমানা থেকে প্রায় ১০০ কিঃমিঃ দূরে তাদের উপস্থিতি তেহরানের জন্যে উত্তেজনার আরেকটি উৎস – যার ফলে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবের সাথে সামঞ্জস্যে তাদেরকে আরো সময় ও সংস্থান এবং সম্ভবত শক্তিও ব্যয় করতে হবে।

ইরানের জন্যে আরো বড় সম্ভাব্য সমস্যা হলো – উত্তর ইরানে প্রভাব বিস্তারের জন্যে আজারবাইজান বিদেশী শক্তিগুলোর জন্যে একটি জাম্পিং পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। তুরস্কের বাইরেও আমেরিকার সাথে আজারবাইজানের সম্পর্ক ২০২০ সালের যুদ্ধের আগে থেকেই ইরানের জন্যে উদ্বেগের বিষয়। ওয়াশিংটন প্রায়শই বাকুর সমালোচনা করলেও দু দেশের স্বার্থ বেশ ক-টি ইস্যুতে একত্রিত হয়। তারা ইউরোপীয় শক্তি সুরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় হুমকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক সাথে কাজ করে। মার্কিন সংস্থা ব্ল্যাকওয়াটারের (এখন একাডেমি নামে পরিচিত) ভাড়াটেরা আজারবাইজানে সামুদ্রিক প্রশিক্ষণ দেয় এবং মার্কিন-আজারি নৌবাহিনীর জন্যে জাহাজ সরবরাহ করে।

তেহরানের জন্যে বড় ভয় হলো ইসরাইলি প্রভাবের সম্ভাব্য বৃদ্ধি। কারাবাখ যুদ্ধ দেখিয়েছিলো যে, বাকু ইসরাইলের প্রযুক্তিতে কতোটা নির্ভরশীল। বিভিন্ন দিক থেকে তাদের সমর্থন জয়ে অবদান রেখেছে। আজারবাইজান-ইসরাইল সম্পর্ক এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে, তুরস্ক ও ইসরাইলের মাঝে মধ্যস্থতায় বাকুর আগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বাকু তেহরানের স্বার্থকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানাবে – এমন সম্ভাবনা নেই। তুরস্ক, ইসরাইল ও ইরানের স্বার্থের মাঝে ভারসাম্য বজায়ে বিচক্ষণ কূটনীতির দরকার হবে। সূত্র: আলজেমেইনার।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে