আফগানিস্তান ছাড়ার পর, তুরস্ককে হিসেব করবে আমেরিকা: এরদোয়ান

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট: সাইফুল ইসলাম।
আওয়ার টাইমস্ নিউজ: গত রোববার ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ব্রাসেলস সফরের প্রাক্কালে ইস্তাম্বুলে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদেরকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন: আমেরিকা খুব শিগগিরই আফগানিস্তান ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা চলে যাওয়ার মুহূর্ত থেকেই সেখানে আমেরিকার একমাত্র নির্ভরযোগ্য দেশ হবে তুরস্ক। মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ার পর, আফগানিস্তান নিয়ে তুরস্কের পরিকল্পনা কী – সে ব্যাপারে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে তুর্কি কর্মকর্তারা। তারা এতে সন্তুষ্ট হয়েছে। ন্যাটো সম্মেলনের সাইডলাইনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে বৈঠকে আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা নিয়ে বলার মতো কথা আছে।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা গিয়েছে, এরদোয়ান-বাইডেন রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়ে গেছে। তবে বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি।

উল্লেখ্য, ক্ষমতায় আসার আগেই ২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ানকে ‘একনায়ক’ আখ্যায়িত করেন বাইডেন। তুরস্কে এরদোয়ানবিরোধীদের সমর্থন দেয়ার কথাও বলেন তিনি। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসে অভিষেকের পর, বিশ্বনেতারা বাইডেনকে অভিনন্দন জানালেও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠাতে সময় নেন এরদোয়ান। এমন পরিস্থিতিতেই গতকাল (সোমবার) ব্রাসেলসে পরস্পরের মুখোমুখি হন দু নেতা।

যাহোক, মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পরও দেশটিতে থেকে যেতে চায় ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক। ইতোমধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার করেছে তারা। তবে তখন তারা কীভাবে দেশটিতে থাকতে আগ্রহী, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত জানা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তুর্কি কর্মকর্তা বলেন: তুরস্ক আফগানিস্তানে থাকতে চাইলে, তারা কীসের ভিত্তিতে সেখানে থাকবে? ন্যাটোর অধীনে কিংবা দ্বিপক্ষীয় শর্তে? ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষকতায় হলে, কার কর্তৃত্বে সেখানে থাকবে তারা? পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তানে তুরস্কের উপস্থিতি দেখতে চায়। তারা কাবুল বিমানবন্দরের সুরক্ষা চায়। তবে কেউ সমর্থন না দিলে, তুরস্ক কেন জোরালো চেষ্টা করবে? এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করা দরকার।

উল্লেখ্য, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা এবং ভূমধ্যসাগরে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে বিরোধের পর, থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে আঙ্কারার সম্পর্কে কিছুটা ফাটল দেখা দিয়েছে। এখন কাবুল বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব পেলে, পশ্চিমাদের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, তারা তুরস্কের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাচ্ছেন। কিন্তু এ কাজের জন্যে আমেরিকার কাছ থেকে অনেক কিছু চাইছে আঙ্কারা।

অবশ্য শনিবার তালেবান জানিয়েছে, আফগানিস্তানের প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড, এর বিমানবন্দর, বিদেশী দূতাবাস ও কূটনৈতিক অফিসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আফগানদের দায়িত্ব। ফলে, আমাদের দেশে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার আশা কারো করা উচিত নয়। কেউ এ জাতীয় ভুল করলে, আফগান জনগণ ও ইসলামী আমিরাত তাদের দখলদার হিসেবে বিবেচনা করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে!

তবে আমার মনে হয়, কয়েকটি কারণে আফগানিস্তানে তুরস্ক থেকে যেতে চাচ্ছে:

প্রথমত, আফগানিস্তান থেকে অনেক আগেই (১৯৮৯ সালে) রুশরা হেরে ফিরে গেছে। তখন এ তালেবানের আদি রূপ মুজাহিদীনকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিলো আমেরিকা। এবার চীনা ও রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে সেই মুজাহিদীনের বর্তমান সংস্করণ তালেবানই ন্যাটো বা মার্কিন বাহিনীকেও বিদায় করছে। তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে রাশিয়ার আবারো আফগানিস্তানে আসার আগ্রহ বা সম্ভাবনা দেখি না। তাছাড়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর, রাশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের সীমান্তও নেই। কিন্তু ন্যাটো বাহিনী চলে গেলে, আফগানিস্তানে তাদের সবচেয়ে পরাক্রমশালী প্রতিবেশী চীন প্রবেশ করতেই পারে। কেননা, চীন যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগুচ্ছে, তাতে তাদের সীমান্তের দেশ আফগানিস্তানকে তারা স্বাভাবিক কারণেই তাদের বলয়ে নেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। সম্প্রতি তালেবানরা চীনের অর্থনৈতিক সমর্থন ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিয়ে আফগানিস্তানের শহরগুলোতে মোটরওয়ে নির্মাণের চীনা পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে! এছাড়া, তারা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামার খনির কাজে কাবুলের কাছে চীনা অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পকেও সমর্থন করেছে। এ অবস্থায় তুরস্ক যে কোনোভাবে আফগানিস্তানে থেকে যেতে পারলে, চীনের দুরভিসন্ধি চরিতার্থ হবে না। এরদোয়ান সরকার তালেবানকে সম্ভবত বোঝাতে চাচ্ছে যে, চীন তালেবানদের সাথে অতীত শত্রুতা ভুলে এখন যতোই নরম সুরে কথা বলুক না কেন – ওরা মজ্জাগতভাবেই নাস্তিক্যবাদের প্রতিনিধি। মুসলিমদের ব্যাপারে চীনের আসল নীতিই হচ্ছে, উইঘুর মুসলিমদের সাথে চীনের বর্তমান আচরণ। অন্যদিকে, তুর্কি ও আফগানরা সুন্নী হানাফী মুসলিম। তাদের লক্ষ্য মূলতই একই – পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মহানবীর (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাজনৈতিক মহাশিক্ষা – খেলাফত কায়েম। আর এজন্যে সবার আগে দরকার মুসলিম জাতীয়তার ভিত্তিতে মিল্লাতের একতা। তালেবানদের অন্যতম আদর্শও ধর্মীয় জাতীয়তা।

দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তান ছাড়াও আরো ১২টি দেশে তুরস্কের সামরিক-ঘাঁটি বা কোনো জোটের সাথে সামরিক উপস্থিতি রয়েছে; যথা- আলবেনিয়া, আজারবাইজান, বসনিয়া-হার্জিগোভিনা, ইরাক, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, কসোভো, লেবানন, লিবিয়া, উত্তর সাইপ্রাস, কাতার, সোমালিয়া ও সিরিয়া। কোনো জোটের সাথে থাকার চেয়ে এককভাবে থাকাটা অবশ্যই বেশি নিরাপদ ও সুবিধাজনক। কাজেই, আফগানিস্তানে তুরস্ক ন্যাটো নয়, বরং এককভাবে থেকে যেতে পারলে, তা হবে এরদোয়ানের পরারাষ্ট্রনীতির অনেক বড় একটি কৃতিত্ব। এতে এতোদিনে আফগানিস্তানে ন্যাটোর অধীনে থেকে ‍তুরস্ক যা করতে পারেনি, তা করার সুযোগ ও স্বাধীনতা অবশ্যই পাবে।

তৃতীয়ত, এ মুহূর্তে মুসলিম দু পরাশক্তি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সম্পর্ক খুবই চমৎকার! ফলে, আফগানিস্তানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি দেশটির প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে তুরস্কের সম্পর্ককে আরো জোরদার করবে – যা এতোদিন ন্যাটোর অধীনে থেকে সম্ভব হয়নি।

চতুর্থত, ন্যাটোর বিদায়ে তালেবানরা যতোই হামতাম করুক না কেন কিংবা তারা দেশটির একক ক্ষমতার অধিকারী হোক না কেন – আসল কথা হচ্ছে, মজবুত অর্থনীতি ছাড়া যে কোনো দেশ বা সরকারই অচল। অথচ সবচেয়ে গরীব ১০টি দেশের অন্যতম আফগানিস্তান! কাজেই, তাদের বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া উপায় নেই। এ অবস্থায় তুরস্ক কতোটা সাহায্য করতে পারবে, এরদোয়ান সরকার খুব সম্ভব তা নিয়েই তালেবানের সাথে লবিং চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য আফগানিস্তানকে খয়রাতী বা ঋণ সাহায্য তুরস্কের চেয়ে অনেক বেশি দিতে পারে সউদী আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু সামরিক সহায়তায় এবং বাণিজ্যিক লাইন-ঘাট করতে তুরস্ক এগিয়ে। আবার তালেবান সরকারকে সউদী ও আমিরাত সরকারের খুব বেশি সহায়তা তাদের মোড়ল আমেরিকা পছন্দ করবে না। কিন্তু তুরস্ককে ঠেকাতে মার্কিন সাহায্য ছাড়া এ রাজতন্ত্রিক আরব দু দেশের উপায়ও নেই। সব কিছু মিলিয়ে আফগানিস্তানের জন্যে সবচেয়ে বেশি কে কল্যাণকর – চীন নাকি সউদী আরব নাকি আমিরাত নাকি তুরস্ক – তালেবানরা এখন সে হিসেবই কষছে। তবে তুরস্কের মজবুত পররাষ্ট্রনীতি বলছে, আফগানিস্তানে তুরস্কের থেকে যাওয়ার প্রস্তাব তালেবানরা আপাতত প্রত্যাখ্যান করলেও শেষ পর্যন্ত তুরস্কেরই জেতার সম্ভাবনা বেশি। কেননা, এরদোয়ান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন: “ন্যাটো চলে যাওয়ার মুহূর্ত থেকেই সেখানে আমেরিকার একমাত্র নির্ভরযোগ্য দেশ হবে তুরস্ক।” এতে বোঝা যায় যে, এরদোয়ান সরকারের আফগানিস্তান নীতির ব্যাপারে তালেবানের সাথে খুব সম্ভব বোঝাপড়া হয়ে গেছে – যা ব্রাসেলসে এরদোয়ান-বাইডেন আলোচনার পর, সময় মতো প্রকাশ পাবে। আর পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও চাবেন যে, তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু তুরস্ক আফগানিস্তানে থেকে যাক। অবশ্য পরাশক্তি চীনও জোর লবিং অব্যাহত রেখেছে ন্যাটোর সাথে সাথে তুরস্ককেও আফগানিস্তান থেকে খেদাতে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হয়।

পঞ্চমত, ন্যাটো যখন আফগানিস্তানে পরাজিত – তখন স্বাভাবিকভাবেই ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের আফগানিস্তানে থেকে যাওয়াটা বাইডেন সরকার সমর্থন করবেই। তাহলে আমেরিকার প্রধানতম শত্রু চীন অন্তত আফগানিস্তানে তেমন সুবিধা করতে পারবে না। এখন তুরস্ক আফগানিস্তানে টিকেই গেলে, আমেরিকা চাবে – তুরস্ক যেনো সেখানে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে, অর্থাৎ চীনকে যথাসম্ভব ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু একজন মার্কিন কর্মকর্তা যেমনটি বলেছেন: “কিন্তু এ কাজের জন্যে আমেরিকার কাছ থেকে অনেক কিছু চাইছে আঙ্কারা।” সেটি আসলে কী? এফ-৩৫ জঙ্গীবিমান নয়তো? সময়ই তা বলে দেবে। নিজস্ব প্রতিবেদন।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে