ইহুদি ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে: আইসিসি

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ তদন্ত ও বিচার শুরুর রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত – আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট)। আর ফিলিস্তিনের প্রত্যাশাও ছিলো এমনটি। তাই, এ রায়কে স্বাগতও জানিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে, বিচারিক এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরাইল। যুগের পর যুগ ধরে নিজ ভুখণ্ডে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে মজলুম ফিলিস্তিনীরা অবশেষে পাচ্ছেন বিচার চাওয়ার সুযোগ। ফিলিস্তিনে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ তদন্তের এখতিয়ার রয়েছে আইসিসির। শুক্রবার বেশিরভাগ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে এ রায় দেয় আইসিসি। ফলে, ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্তের পথ খুলে গেলো। এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষ বলেছেন: অধিকৃত অঞ্চলে মজলুম মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার পেলাম। গাজায় তিনটি যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো তারা। আশা করব শিগগিগরই ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

রয়টার্স জানিয়েছে, রায়ের মাধ্যমে কখনো না হওয়ার থেকে দেরীতে হলেও ফিলিস্তিনীরা ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণের বিচার পাবে বলে প্রত্যাশা করছে। তবে শুক্রবারের আইসিসির ঐ রুলিংয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে ইসরাইল। তারা ভালো মানুষ সেজে বলছে, ফিলিস্তিনীদের সংহিংসতা থেকে আত্মরক্ষা করতেই তারা পাল্টা আক্রমণ করে! এর আগে শুক্রবার আইসিসির প্রি-জাস্টিস চেম্বারের তিনজন বিচারক ফিলিস্তিনে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও নৃশংসতার বিচারের এখতিয়ার আইসিসির আছে বলে রায় দেন। রুলে বলা হয়, হামাসসহ ফিলিস্তিনী ও ইসরাইলি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আক্রমণের ঘটনা আইসিসি তদন্ত করতে পারবে। যদিও নিকট ভবিষ্যতেই কোনো ঘটনা তদন্তের সম্ভাবনা নেই। আইসিসির প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুদা বলেন: আমি এখন ২০১৪ সালে ইসরাইল বনাম চরমপন্থী হামাসের গাজার যুদ্ধ, ২০১৮ সালের গাজা সীমান্তে বিক্ষোভ এবং অধিকৃত অঞ্চলে ইসরাইলের বসতি তদন্ত করবো।

গাজার খান ইউনুসের তওফিক আবু জামা নামে এক ফিলিস্তিনী বলেন: ২০১৪ সালে সাত সপ্তাহব্যাপী ঐ যুদ্ধে ইসরাইলের বিমান হামলায় আমাদের যৌথ পরিবারের ২৪ সদস্য নিহত হন। ঐ যুদ্ধে মোট ২,১০০ (দু হাজার একশ’) ফিলিস্তিনীর মৃত্যু হয় – যাদের অনেকেই ছিলেন সাধারণ নাগরিক। অন্যদিকে, এতে ইসরাইলের ৬৭ জন সেনা ও ৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। খান ইউনুস এলাকায় বিমান হামলার ঘটনার ব্যাপারে ইসরাইলি সামরিক আদালত একটি তদন্ত করে রায় যে, ঐ বিমান হামলা সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে করা হয়েছিলো এবং তা আইন সম্মত ছিলো!

আইসিসির রায়ের বিষয়ে ফিলিস্তিনীদের মর্টার ও বোমার আঘাতে দু পা খোয়ানো গাজা সীমান্ত এলাকার ‘ইসকল’ আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রধান গাদি বারকোনি (ইহুদি) আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন: আমরা ভালো মানুষ। নিষ্পাপ শিশুদের হত্যার জন্যে আমরা গুলি করি না। কিন্তু তারা আমাদের হত্যার জন্যে গুলি করে। গাজা ও পশ্চিম উপত্যাকার প্রত্যেক নাগরিকের মৃত্যুতে আমি কাঁদি। সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

তবে আইসিসির রায়ের পর, ফিলিস্তিন ও ইসরাইল উভয়ই একটি বিষয়ে একমত হয়েছে। আর তা হলো, আইসিসির কাছ থেকে তারা দ্রুত কোনো তদন্ত প্রত্যাশা করে না। প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরাইলি কর্মকর্তা বলেন: এমন নয় যে, আগামীকাল সকালেই গ্রেপ্তার পরোয়ানা জারি হবে। আইসিসির রায়ের বিষয়ে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে করণীয় ঠিক করতে পরামর্শ করবেন। আইসিসির রায় রাজনৈতিক। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সাবেক আইন উপদেষ্টা ডায়না বাট্টু বলেন: ফিলিস্তিনীরা এখনো অনেক বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন। সত্যিকারের বিচারের পথ এখনো অনেক দূরে। আইসিসি যেনো অগ্রসর হতে না পারে, সেজন্যে নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হবে। আইসিসি এ প্রথমবারের মতো ইসরাইলি কর্মকাণ্ডকে অবৈধ ঘোষণা করেছে – এমন নয়। আগেই আইসিসি এমনটি করেছে। কিন্তু জবাবে বিশ্ব নেতারা কিছুই করেনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউস ছাড়ার তিন সপ্তাহ পর, আইসিসি এ রায় দিলো। ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা আন্তর্জাতিক আদালতের বেনসোদাসহ দু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। গত মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর, বাইডেন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করবেন বলে জানিয়েছিলেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু শুক্রবারের আইসিসির রায়কে ‘ইহুদিবিরোধী’ উল্লেখ করে সকল শক্তি দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দেন। ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালিকি রাযের পর, সেদিনকে ‘ঐতিহাসিক দিন’ বলে অভিহিত করে অতীতে ইসরাইল আইন-কানুন না মেনে ফিলিস্তিনীদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেন।

তবে আন্তর্জাতিক আদালতের তদন্ত থেকে ফিলিস্তিন বাদ যাবে না। ফিলিস্তিনের হামাসকে ইসরাইল ও ‍পশ্চিমা বিশ্ব ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে গণ্য করে। তাদের অভিযোগ – ফিলিস্তিনীদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হামাস ইসরাইলের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণ করে। তবে হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। আইসিসির তদন্তে তাদের ভয় নেই জানিয়ে হামাসের মুখপাত্র হাজেম বলেন: হামাস ও ফিলিস্তিনীদের প্রতিরোধ বৈধ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সূত্র: রয়টার্স।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে