জেরুজালেমের কর্তৃত্ব আমরা ফিলিস্তিনীদের হাতে দিতে চাই: এরদোয়ান

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট: সাইফুল ইসলাম।
আওয়ার টাইমস্ নিউজ: সোমবার তিনটি কংগ্রেসনাল সূত্রে রয়টার্স জানিয়েছে, ইসরাইলের কাছে ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বাইডেন প্রশাসন। এসব অস্ত্রের মাঝে রয়েছে, বোয়িং কোম্পানির তৈরী ‘জয়েন্ট ডিরেক্ট অ্যাটাক মিউনিশন’ নামে বিশেষ রকমের বোমা।

বিদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রির চুক্তি চূড়ান্তের আগে নিয়মিত পর্যালোচনার অংশ হিসেবে প্রশাসনের তরফ থেকে কংগ্রেসকে ৫ই মে ব্যাপারটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। আইন মোতাবেক, ১৫ দিনের ভেতরে কংগ্রেসে কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানাতে পারবেন। তবে রয়টার্স বলছে, ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনীদের মাঝে চলমান সহিংসতা সত্ত্বেও এ চুক্তিতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আপত্তির সম্ভাবনা নেই।

কংগ্রেশনাল সহযোগীরা জানান, কংগ্রেসের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান নেতাদের তরফ থেকে কোনো আপত্তির কথা জানা যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, এ ধরনের চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য বা বিস্তারিত নিশ্চিতের ক্ষেত্রে আইনি বাধা আছে। আমরা বর্তমান সহিংসতা সম্পর্কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একটি টেকসই শান্তির লক্ষ্যে কাজ করছি।

অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরাইলের চলমান হামলার পর, অস্ত্রবিরতির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে উনি জানান, সহিংসতা থামাতে মিশর ও অন্যান্য দেশের সাথে কাজ করছে আমেরিকা; যদিও সহিংসতা থামানোর আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বিবৃতিও আটকে দিয়েছে আমেরিকা।

এএফপি জানিয়েছে, ইসরাইলকে এভাবে সমর্থন দেয়ায় বাইডেনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। তুরস্কের টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেছেন: আপনি আপনার রক্তাক্ত হাত দিয়ে ইতিহাস লিখছেন! এ কথা বলতে আপনি আমাদের বাধ্য করলেন। কেননা, আমরা এ নিয়ে আর চুপ থাকতে পারি না। আজ আমরা দেখলাম, ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে সই করেছেন আপনি।

এদিকে, ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট ম্যাঁক্রো, মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি ও জর্দানের বাদশাহ আবদুল্লাহ’র বৈঠকের পরপর গতকাল (মঙ্গলবার) মিশরের সামরিক জান্তা সিসি ঘোষণা করেছেন: সাম্প্রতিক ঘটনার ফলস্বরূপ গাজা উপত্যকায় পুনর্নির্মাণে মিসর ৫০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দেবে। এছাড়াও মিসরীয় বিশেষজ্ঞ নির্মাণ সংস্থাগুলো এ পুনর্নির্মাণ বাস্তবায়ন করবে। আমি দু দেশকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছি। আশা করি, যতো দ্রুত সম্ভব – তারা এ সংকটময় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসবেন।

ওদিকে, হামাসের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে রকেট হামলায় বিপাকে পড়েছিলো গোটা ইসরাইল। সোমবার থেকে দেশটির বিভিন্ন শহরে গাজা থেকে বৃষ্টির মতো রকেট হামলা চালানো হয়। পরদিন গাজায় ৬০টি জঙ্গীবিমান নিয়ে বিমান হামলা করে ইসরাইল। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র হিদাই জিলম্যান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন: ‘মাত্র আধা ঘণ্টায় আমরা ৬৫টি স্থানে আঘাত হেনেছি। আমরা ফিলিস্তিনী সংগ্রামীদের বেশ কয়েকটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করে দিয়েছি – যেগুলোর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ১৫ কিঃমিঃ।’ তবে তার এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করে কোনো বার্তা দেয়নি হামাস।

এদিকে, পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ফিলিস্তিনী-ইসরাইলি সংঘর্ষে ১৪জন ফিলিস্তিনী আহত হয়েছেন। আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় এক ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। এছাড়া, বেশ ক-জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনী প্রতিবাদকারীদের ছোঁড়া গুলিতে ইসরাইলি দু সেনা আহত হয়েছে।

মেগান ডেভিড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের বরাতে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, হামাসের ছোঁড়া রকেটে গাজা সীমান্তে ইসরাইলের দু থাই শ্রমিক নিহত এবং অন্তত ৭ জন আহত হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে সরোকা মেডিকেল সেন্টারে নেয়া হয়েছে। তাদের একজনের অবস্থা গুরুতর। গাজা থেকে ৫০টি রকেট ঐ অঞ্চলে আঘাত হানে। এর মাঝে একটি রকেট গোলাঘর ও অপরটি আবাসিক এলাকায় বিস্ফোরিত হয়। এতে আবাসিক ভবন ও গোলাঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বিবিসি জানিয়েছে, ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় এশকল অঞ্চলে হামাস উপর্যুপরি রকেট হামলা চালায়। এতে ১০ ইসরাইলি হতাহত হয়। এদের ৪ জনের অবস্থা গুরুতর।

এর আগে গাজার এরেজ ক্রসিং এলাকায় মর্টার শেলের হামলায় এক ইসরাইলি সেনা আহত হয়। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করে, লরিগুলোকে মানবিক সহায়তা প্রদানের অনুমতি দিতে ক্রসিংটি চালু হওয়ায় হামাস মর্টার ছোঁড়ে।

ওদিকে, হামাসের ঐ রকেট হামলার পর, সীমান্ত আবার বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল। ফলে, সেখানে ত্রাণবাহী ট্রাক আর ঢুকতে পারছে না। নরওয়েজিয়ান রিফুজি কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মিডিয়া উপদেষ্টা কার্ল স্কেমব্রি আল-জাজিরাকে জানান, গাজার লোকদের এখন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি জরুরি মানবিক সহায়তাও দরকার। সেজন্যে সীমান্তগুলো খোলা রাখতে হবে। কিন্তু কারেম আবু সালেম ও বেইত হ্যানুন ক্রসিং বন্ধ রাখলে, অঞ্চলটিতে ‘শ্বাসবন্ধ হওয়ার’ অবস্থা সৃষ্টি হবে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্যে অস্ত্রবিরতিও দরকার।

গাজার সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরাইলি বাহিনীর বিমান হামলায় সেখানকার কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ প্রচুর বাড়ীঘর, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গাজার বেশিরভাগ এলাকা রয়েছে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় গাজার হাসপাতালগুলোর করোনা রোগীরা সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় আছেন।

এদিকে, ইরানের প্রেস টিভি জানিয়েছে, সোমবার ভোরে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী গাজা উপত্যকায় নতুন করে সিরিজ বিমান হামলা চালানোর পর, ইসরাইলের একটি যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জুদ্দীন আল-কাসসাম বিগ্রেড দাবি করেছে। এছাড়া, কাসসাম ব্রিগেড গতকাল (মঙ্গলবার) ইহুদি উপশহর ‘হার্টসলিয়া’-তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে এ হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। এর আগে হামাসের যোদ্ধারা ইসরাইলের আশকেলান উপকূলে তেল ও গ্যাস উত্তোলন কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

ওদিকে, ইসরাইলের ভেতরে ইহুদিদের সাথে আরব মুসলিমদের সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। লোদ শহরে ৪৮ ঘণ্টার জন্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। উগ্র ইহুদিরা সোমবার রাতেও নেতানিয়াহুর বাড়ীর সামনে সমবেত হয়ে গাজায় হামলা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছে। এদের অনেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কেউ কেউ দাবি করে থাকেন যে, বাইরে থেকে আসা ইহুদিরা নিরীহ এবং সামরিক ক্ষেত্রে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। কিন্তু পরশু রাতে এ ধরণের ইহুদি অভিবাসীরা গাজায় হামলা ও হত্যা-নৃশংসতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে নিজেদের স্বরূপটা দেখিয়ে দিয়েছে।

এদিকে, টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের গাজায় বিমান হামলা চলাকালেই লেবাননেও বোম্বিং করেছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী। গতকাল সকালে ইসরাইল জানায়, লেবানন থেকে ছোড়া রকেটের জবাবে এ বোম্বিং করা হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

আইডিএফ (ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস) জানায়, লেবানন থেকে ৬টি রকেট ছোড়া হয়েছিলো। তবে একটিও ইসরাইল-লেবানন সীমান্ত অতিক্রম করতে পারেনি। আর্টিলারী দিয়ে সবগুলো ভূপাতিত করা হয়েছে। রকেটগুলো ছুঁড়েছে কোনো ফিলিস্তিনী ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। এ হামলার জন্যে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দায়ী নয়।

অন্যদিকে, লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনী বলেছে, ইসরাইল ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করে যাচ্ছে। ২২টি বোমা ফেলেছে তারা। আর এ গোলাবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আতঙ্কে ভুগছেন ঐ এলাকার সাধারণ মানুষ।

রয়টার্স বলছে, লেবাননে ইসরাইলি বোম্বিংয়ে গাজায় চলমান সংঘাত আরেকটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা খুব বেশি নেই।

ওদিকে, সংঘাতের নবম দিনে গাজায় ইসরাইলি হামলা কিছুটা কম ছিলো। গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলের বিমান হামলায় সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে অনেক বাড়ী বিধ্বস্ত হয়েছে ইসরাইলি হামলায়। হামাসও রকেট ছুঁড়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

এদিকে, স্পুটনিক জানিয়েছে, সোমবার রাতে ইসরাইলের হাইফা উপকূলের একটি গ্যাসক্ষেত্রে আগুন লেগেছে। ইসরাইলি আগ্রাসনের জবাবে ফিলিস্তিনীদের রেকর্ড সংখ্যক রকেট হামলার ভেতরেই এ অগ্নিকাণ্ডের খবর এলো। চলতি মাসের শুরুর দিকে বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছিলো যে, হামাস ঐ গ্যাসফিল্ডে হামলা চালাতে পারে। কিন্তু সেখানে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে কি-না তা এখনো স্পষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ইসরাইলের গ্যাস ফিল্ডের প্ল্যাটফর্মে অগ্নিকাণ্ডের ছবি ভাইরাল হয়েছে। হাইফার আশেপাশের ইসরাইলি বাসিন্দারা এসব ছবি শেয়ার করেছেন। তারা বলছেন, গ্যাস ফিল্ডের প্ল্যাটফর্মে বড় ধরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বলছে, এটা কারিগরি ত্রুটির কারণে ঘটেছে এবং এতে কেউ হতাহত হয়নি। দু সপ্তাহ আগে ইসরাইলের হাইফার একটি তেল শোধনাগারে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং এর ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তখন অগ্নিকাণ্ডের কারণে তেল সরবরাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিলো ইসরাইল।

ইসরাইল বনাম ফিলিস্তিনের সাম্প্রতিক সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। অবসানের ইঙ্গিতও সামান্য। এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় প্রায় ১০০টি শিশু ও ৩৬ জন নারীসহ মোট ২১৪ জন শহীদ হয়েছেন, প্রায় ৪৫০টি ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৫২ হাজারের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। তাদের মাঝে প্রায় ৪৭ হাজার ফিলিস্তিনী জাতিসংঘ পরিচালিত ৫৮টি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন।। অন্যদিকে, হামাসের হামলায় ১২ জন ইসরাইলি নিহত ও অন্তত এক হাজার ইসরাইলি আহত হয়েছে।

ওদিকে, ওআইসি’র জরুরি বৈঠকে সউদী আরব, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের মতো সদস্যগুলো পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করছে। তবে তুরস্ক শুধু নিন্দা না জানিয়ে ফিলিস্তিনীদের সুরক্ষায় ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রটেকশন ম্যাকানিজম’ নামে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু প্রতিনিধিদের বলেন: আগ্রহী দেশগুলোর সামরিক ও আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করে ফিলিস্তিনীদের শারিরীক সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। ২০১৮ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবের আওতায়ই আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃতভাবেই এ ধরনের বাহিনী গঠন সম্ভব। অন্য কোনো বিবেচনা থাকা উচিত নয়। এখন আমাদের একতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার কার্যকারিতা দেখানোর সময়। মুসলিম জাহান প্রত্যাশা করছে – ওআইসি নেতৃত্ব ও সাহস দেখাবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে তুরস্ক।

তবে এ ধরনের আন্তর্জাতিক কোনো বাহিনী গঠনের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি ওআইসি’র সভায়। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে এক আলাপচারিতায় একই ধরনের প্রস্তাব সামনে আনেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

এদিকে, সোমবার আঙ্কারায় রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান জেরুজালেমে নতুন প্রশাসক চেয়েছেন। তিনি বলেন: জেরুজালেমের মতো মুসলিমদের পবিত্র নগরীর দায়িত্ব ইসরাইলের মতো সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের হাতে থাকতে পারে না। ইহুদিবাদীদের হাত থেকে জেরুজালেমের কর্তৃত্ব আমরা ফিলিস্তিনীদের হাতে দিতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা কূটনীতিক ও সামরিক উভয়ভাবেই ফিলিস্তিনকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। মুসলিমদের পবিত্রতম মসজিদে হামলাকারী এবং নিরপরাধ নারী-শিশুসহ ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের ওপর বোমা হামলাকারী ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইল এ প্রাচীন নগরীর কর্তৃত্ব করতে পারে না।

ওদিকে, গত সপ্তাহে চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপ শিরোপা জয়ের পর, মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে ইসরাইলের বর্বর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন লেস্টার সিটির বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তারকা হামজা চৌধুরী। এবার খেলা শেষে মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ালেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তারকা ফুটবলার পল পগবা ও আমাদ দায়ালো। চলমান প্রিমিয়ার লিগে মঙ্গলবার ফুলহামের বিপক্ষে ম্যানইউর ম্যাচ শেষে এভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে সমর্থন জানান তারা। খেলা শেষে খেলোয়াড়রা মাঠ প্রদক্ষিণের সময় ম্যানচেস্টারের এক ভক্ত পগবাকে এ পতাকাটি দেন। এরপর তিনি ও আমাদ দায়ালো সেটি ওড়ান। জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী তারকা মেসুত ওজিলের মতো সদাই ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন পল পগবা। নিরপরাধ ফিলিস্তিনীদের জন্যে দোয়াও করতে দেখা গেছে তাকে। এর আগে এক টুইটে পগবা বলেছিলেন: ‘পৃথিবীর প্রয়োজন শান্তি ও ভালোবাসা। অতি দ্রুত সহায়তা পৌঁছাবে। সবাইকে একে অপরকে ভালোবাসতে হবে।’ ঐ টুইটে ফিলিস্তিনদের জন্যে দোয়াও চেয়েছেন ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ী এ তারকা।

উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালে পাশ্চাত্যের প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাথে পাঁচদিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া ও জর্দানের সমবেত সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। তখন ইসরাইল গাজা উপত্যকা, তেইশ হাজার বর্গমাইলের মিসরের সিনাই উপদ্বীপ ও সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্দানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। এ যুদ্ধের পর, প্রথমবারের মতো পবিত্র জেরুজালেম ইসরাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। সেখান থেকে বহু ফিলিস্তিনীকে বিতাড়িত করে ইসরাইল।

অবশ্য ১৯৭৯ সালের ২৬শে মার্চ ওয়াশিংটনে মিসর-ইসরাইল শান্তি চুক্তি হলে এবং ইসরাইলকে স্বীকৃতির বিনিময়ে সিনাই উপদ্বীপ ফিরে পায় মিসর।

১৯৮৮ সালে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনীদের দাবির প্রেক্ষিতে তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জর্দানের বাদশা হুসাঈন প্রায় ৩,৬৩৭ বর্গমাইলের পশ্চিম তীরের উপর থেকে জর্দানের দাবি প্রত্যাহার করে নেন।

আর সিরিয়া বহু চেষ্টা করেও প্রায় ১,২০০ বর্গমাইলের গোলান মালভূমি আজও উদ্ধার করতে পারেনি। সামরিক ও কৌশলগত কারণে এ মালভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। এর বাইরেও এটি মিঠাপানির প্রধান উৎস। ইসরাইলে ব্যবহৃত মিঠাপানির তিন ভাগের প্রায় এক ভাগ জোগান দেয় গোলান। জায়গাটি চাষাবাদের জন্যেও বিশেষ উপযোগী। এখানে ফল ও আঙুরের চাষ হয়; পশুপালন হয়। এখান থেকে মাত্র ৪০ মাইল দূরে দামেস্ক এবং দক্ষিণ সিরিয়ার বড় একটি অংশ স্পষ্ট দেখা যায়। ১৯৮১ সালে ইসরাইল গোলানকে নিজের অংশ করে নেয় একতরফাভাবে। দখলের পর থেকেই গোলান মালভূমিতে ইসরাইল বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। মালভূমিটিতে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার লোকের বসবাস। এদের মাঝে ২০ হাজার হলো অবৈধ দখলদারি ইহুদি – যারা ইসরাইলের গড়া ৩০টি বসতি এলাকায় বাস করছে। ইসরাইল প্রতিনিয়ত আরব বা সিরীয়দের বসতবাড়ী দখল করে ইহুদিদের জন্যে বসতি গড়ছে। এ মালভূমির লোকজনকে উৎপাদিত ফসলাদি সিরিয়াতে বিক্রি করতে বাধা দেয় ইসরাইল এবং আস্তে আস্তে সাধারণ জনগণকে তাদের ইচ্ছামতো ফল-ফলাদি চাষের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করে। তারপরে আরব বা সিরীয়নদের ওপর আরোপ করে অতিরিক্ত কর। তাদের কাছে সেচের পানি, সার ইত্যাদি বিক্রি করা হয় চড়া দামে – যা ইহুদিদের কাছে বিক্রি করা হয় প্রায় অর্ধেক দামে! সূত্র: আল-জাজিরা, টিআরটি, পার্সটুডে, রয়টার্স, বিবিসি, স্পুটনিক, হারেৎজ, টাইমস অব ইসরাইল ও অন্যান্য।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে