তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এরবাকান যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন।

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
তুরস্কের ইতিহাসের শেষ সফল সামরিক অভ্যুত্থানের ২৪ বর্ষপূর্তি আজ (২৮শে ফেব্রুয়ারি)। ১৯৯৭ সালের এ দিনটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইসলামপন্থী তখনকার সরকারকে স্মারকলিপি দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ ও সামরিক বাহিনী তথা প্রত্যক্ষ সামরিক শক্তি ব্যবহার না করেই ইসলামপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন এরবাকানকে (১৯২৬-২০১১) বন্দুকের নলের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

উত্তর আধুনিক সামরিক অভ্যুত্থান নামে পরিচিত এ অবৈধ ক্ষমতা দখলে প্রত্যক্ষ সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করছিল তখনকার গণমাধ্যম এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো।

পাঁচজন সামরিক কর্মকর্তা এবং পাঁচজন উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় সুরক্ষা কাউন্সিলের সদস্যরা ২৮শে ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দিলো যে, রাষ্ট্র নাকি “ইসলামপন্থী হুমকির” সম্মুখীন! ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার উপর বড় হুমকি স্বরূপ। এরা একটি স্মারকলিপি জারি করে সকল ধর্মীয় স্কুল বন্ধের, সব বেসরকারি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের এবং বহু ধর্মীয় সংস্থা ও এনজিওর কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি জানায়।

এরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে নামাতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়, তুরস্কের সাংবিধানিক ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মিডিয়া প্রচারনা চালায় এবং সেক্যুলারদের সাথে আঁতাত করে। এ ক্যাম্পেইন চলতে থাকে একই বছরের ১৮ জুন এরবাকানের পদত্যাগ করার দিন পর্যন্ত।

কীভাবে ও কেন এটা ঘটেছে, তা বুঝতে আসুন – আরেকটু পিছনে ফিরে যাই। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে সংবিধান মোতাবেক, তখনকার কট্টর সেক্যুলার এ দেশটির জনগণের ভোটে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে বিজয়ী হয় কল্যাণ পার্টি নামে ইসলামী রাজনৈতিক একটি দল। ব্যাপক জনপ্রিয় ইসলামী একটি সংগঠন “মিল্লি গোরুশ” এর রাজনৈতিক শাখা ছিলো দলটি। ৩৬ বছর ধরে তুরস্কে সোচ্চারভাবে ধর্মীয় রাজনীতি করায় “মিল্লি গোরুশ” আন্দোলনের নেতা এরবাকানকে এবং তার পার্টিকে নিষিদ্ধ করার হয় বারবার। তবুও আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে সেবারই প্রথম ধর্মীয় সংস্থার সাথে যুক্ত ইসলামী রাজনৈতিক কোনো দল জাতীয় নির্বাচন বিজয়ী হয়। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় অন্য দলের সাথে জোট বেঁধে সরকার গঠবেনর দরকার হয় এরবাকানের। কিন্তু সেনাবাহিনী অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তাঁর দলের সাথে ঐক্যজোটের সরকার গঠন না করতে চাপ দেয় এবং সবচেয়ে বড় বিজয়ী দলকে পাশ কাটিয়ে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় অন্য সব দলকে। তবে দেড় বছর পরে বিরোধী দলগুলো টেকসই সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়ার পরে রাষ্ট্রপতি কল্যাণ দলকে জোট গঠনের অনুমতি দেন।

ধর্মনিরপেক্ষ গুষ্টি, সামরিক ও গণমাধ্যম দেশটির মুসলিম পরিচয়কে আরো শক্তিশালী করতে চায় বলে নতুন প্রধানমন্ত্রী এরবাকানের সমালোচনা করেছিলো। তিনি একটি সামাজিক রক্ষণশীল গোষ্ঠির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, মুসলিম দেশগুলোতে সফর করেছিলেন এবং মুসলিম দেশগুলোর মাঝে জি-৭ এর আদলে একটি আন্তর্জাতিক সঙ্ঘ গঠনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী ও গণমাধ্যমের প্রচারে এ দাবি জোড়ালো করে তুলেছিলো যে, তাঁর দল তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি ধ্বংস করতে চায়। তখন গণমাধ্যমে একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিলো “ধর্মনিরপেক্ষতা বিলীন হতে যাচ্ছে; দেশে শরীয়ত আসছে”! এমনকি সেনাবাহিনীর তরফ থেকে তখন ধর্মীয় সংস্থাগুলোকে রাষ্ট্রের জন্যে পিকেকে সন্ত্রাসী সংগঠনের চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে ঘোষণা করা হয়!

সাংবিধানিক আদালত কল্যাণ পার্টিকে যথেষ্ট সেক্যুলার না হওয়ার অভিযোগে সরকার থেকে নিষিদ্ধ করে এবং এরবাকানসহ এ পার্টির অন্যান্য নেতৃস্থানীয় বাক্তিকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে। পরে সেনা সমর্থিত নতুন সরকার ধর্মীয় মত প্রকাশের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই শুরু করে। তারা সরকারি সকল প্রতিষ্ঠান থেকে ধর্মীয় রক্ষণশীল লোকদেরকে বের করে দেয়। একটি ড্রেস কোড আইন কার্যকর করে হিজাব পরা ছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিষেধাজ্ঞাটি অন্যান্য সরকারী প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই কার্যকর ছিলো। এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এর আওতায় আনা হয়।

হাজার হাজার ইসলামপ্রিয় শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়; সাড়ে তিন হাজার মহিলা শিক্ষককে তাঁদের চুল ঢেকে রাখায় বরখাস্ত করা হয়; এগারো হাজার ইসলামপন্থী শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে আরো ৩,৫২৭ শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। এছাড়াও সশস্ত্রবাহিনীর ধর্মীয় ভাবাপন্ন কর্মকর্তাদের ব্যাপকহারে ছাটাই করা হয়। তখন বাহিনীর ১,৬২৫ জন সদস্যকে বরখাস্ত করা হয় এবং আরো ২,৫০০ জনকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়। সামরিক বাহিনীতে কর্মরত সব সদস্যের স্ত্রীদেরকে হিজাব খুলতে বাধ্য করা হয়।

প্রায় হাজার খানেক মানুষকে ভুয়া অভিযোগে জেলে পুরে রাখা হয়েছিলো। প্রায় ১ কোটিরও বেশি লোক এবং অনেক সিভিল সোসাইটিকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। মোট কথা, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের উপরে একটা স্টিম রোলার চালিয়ে দেয়া হয়। তখনকার একজন সেনা কমান্ডার তো বলেই দিলেন: ২৮শে ফেব্রুয়ারি (পরবর্তী এ স্টিম রোলার) এক হাজার বছর ধরে চলবে।

তবে পাঁচ বছর যেতে না যেতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় আসে রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে এরবাকানেরই দল থেকে বেরিয়ে আসা একদল লোক। আর তখন থেকেই শুরু বর্তমান ক্ষমতাসীন একে পার্টির অধ্যায়। ক্ষমতায় এসেই ধর্মীয় মত প্রকাশের বিরোধিতা করে করা আইনগুলো শিথিলের কাজ শুরু করে এরদোয়ানের একে পার্টি এবং ২০১৩ সালে এসে হিজাবের ওপরে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠিয়ে নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু ১৯৯৭ সালের উত্তর-আধুনিক সামরিক অভ্যুত্থানের বিভীষিকাময় দিনগুলো তুর্কিদের মন থেকে কখনই মুছে যাবে না। সূত্র: আনাদোলু নিউজ অবলম্বনে।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে