তুরস্কে আবারো সামরিক অভ্যুত্থানের পদধ্বনি!

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগ-স্থলে অবস্থিত তুরস্কের একশো বছরের ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে বহুবার। সেখানে ক্ষমতায় আসা জনপ্রিয় প্রায় সব নেতাকেই সামরিক অভ্যুত্থানের হুমকি মোকাবেলা করতে হয়েছে। অনেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন; কেউবা ফাঁসীতে ঝুলে মরেছেন!

বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও তাঁর ঊনিশ বছরের শাসনামলে অনেকবার সামরিক অভ্যুত্থানের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। কখনো মোকাবেলা করেছেন রাজনৈতিক চালে; কখনোবা আইন দিয়ে। সবশেষ ২০১৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান মোকাবেলা করেছেন জনগণকে সাথে নিয়ে।

এখন আবার শোনা যাচ্ছে নতুন করে সামরিক অভ্যুত্থানের পদধ্বনি! তুরস্কের ১০৪ জন সাবেক অ্যাডমিরাল এক যৌথ বিবৃতিতে সরকারের একটি খাল খনন প্রকল্প বাতিল এবং ১৯৩৬ সালের মন্ট্রেক্স চুক্তি নিয়ে নতুন কোনো আলোচনা না করতে পরামর্শ দিয়েছেন। একই সাথে এ দু বিষয় নিয়ে সামনে আগালে তুরস্ক ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে বলেও হুঁশিয়ার করেছেন! এ বিবৃতিটি প্রকাশিত হয় শনিবার মাঝ-রাতে।

সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস এবং তুরস্কের বিগত সামরিক অভ্যুত্থানগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যাবে যে, ১০০ উচ্চ পদস্থ সাবেক সামরিক কর্মকর্তার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মধ্যরাতে এ ধরনের ঐক্যবদ্ধ বিবৃতি বিকল্প পন্থায় সরকার উৎখাতে ইন্ধন যোগাবে।

খাল খনন কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

যে খাল খনন নিয়ে এ বিবৃতিটি আসে সেই ‘ইস্তান্বুল খাল’ প্রথম আলোচনায় আসে উছমানীয় সালতানাতের সুলতান সুলায়মানের আমলে। এরপর ১৫৬০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত প্রায় দশবার ইস্তান্বুলে একটি বিকল্প খাল খননের প্রস্তাব করা হয়। সবশেষ ২০১১ সালের নির্বাচনে তখনকার প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান নতুন করে ইস্তান্বুলের বুক চিরে এ কৃত্রিম জলপথ তৈরির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। নির্বাচনী ইশতেহারে এ খাল কাটার ঘোষণা দেন। মর্মর সাগর ও কৃষ্ণ সাগরকে যুক্তকারী এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ‘ইস্তান্বুল খাল’। সুয়েজ খাল ও পানামা খালের মতো বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয়ের আশা‌ দেখানো হয় এ খালের মাধ্যমে। কিন্তু এখানে একটি সমস্যা থেকেই যায়! এ খাল যে দুটি সাগরকে যুক্ত করবে, সে দুটি সাগর তো বসফরাস প্রণালীর মাধ্যমে আগে থেকেই প্রাকৃতিকভাবে যুক্ত! ভূমধ্যসাগর থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার জাহাজ এ ‌বসফরাস প্রণালী দিয়েই‌ কৃষ্ণ সাগরে যায় এবং বিনা টোলে, অর্থাৎ মাগনাই পার হয়‌ এ প্রণালী। তাহলে ইস্তান্বুলকে কেটে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বিলিয়ন ডলারের যে স্বপ্ন এরদোয়ান দেখছেন, তার কী হবে? এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেকেই প্রশ্নটা করে থাকেন। এখানে প্রশ্নটার উত্তর ক-ভাবে দেয়া যায়।

প্রথমত, এ নতুন খাল খনন হলে এটির আয় শুধু যে জাহাজ পারাপারের ওপরই নির্ভরশীল হবে, তেমন না। যেমন- আমরা জানি, বসফরাস প্রণালী দিয়ে পার হওয়া জাহাজ থেকে ঠিকই কোনো টাকা আয় করতে পারছে না তুর্কি সরকার। কিন্তু এ প্রণালীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পর্যটন এবং এ সংশ্লিষ্ট যেসব সেক্টর রয়েছে, সেসব থেকে প্রতি বছর তুরস্কের অর্থনীতিতে যোগ হয় মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। একইভাবে নতুন খাল খনন হলে, এ খনন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে এর তীরবর্তী এলাকায় সরকারের যে বিশাল পরিকল্পনা আছে; যেমন- ট্যুরিজম, নতুন আবাসন প্রকল্প এবং এর সাথে রিলেটেড আরো অনেক প্রকল্প – এগুলো থেকে প্রচুর অর্থ আয় হবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমানে বসফরাসের জাহাজ পরিবহন তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে, অর্থাৎ তুরস্ক নির্ধারণ করে বসফরাস দিয়ে প্রতিদিন কতোটি জাহাজ কখন যেতে পারবে; কখন যেতে পারবে না। আর বসফরাস দিয়ে এখন একটি নির্দিষ্ট সাইজের বড় জাহাজ যেতে পারে না। তাই, সেগুলোকে বিকল্প পথ দিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া, এখন একটি জাহাজের বসফরাস পারের অনুমতি ও সিরিয়াল পেতে এক থেকে তিনদিন লেগে যায়।
তুরস্ক এ জাহাজ চলাচলের উপর আরেকটু বিধি-নিষেধ আরোপ করলে, অর্থাৎ আরেকটু কম জাহাজ চলাচল করালে বা জাহাজগুলোকে আরেকটু ওয়েট করালে দেখা যাবে – সেগুলোর তিনদিনেরও বেশি অপেক্ষা করা লাগতে পারে। একটি মালবাহী জাহাজের একদিন দেরী মানে – ওখানে বিশাল একটা ক্ষতির বিষয়। সুতরাং এ জাহাজগুলো তখন ভিন্ন পথ দিয়ে যেতে বাধ্য হবে এবং তারা স্বাভাবিকভাবে বিকল্প রুট ব্যবহার করবে টাকা দিয়ে হলেও।

তুরস্কে কেন বারবার সামরিক অভ্যুত্থান হয়?

সামরিক অভ্যুত্থান যেনো দেশটির পিছু ছাড়ছে না। ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভালোই চলছিলো প্রথম কয়েক দশক। কিন্তু আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো নামক সামরিক জোটটির সদস্য হওয়ার পর থেকেই সামরিক অভ্যুত্থানের শুরু দেশটিতে! দেশটির ন্যাটো সদস্য পদ আর সামরিক অভ্যুত্থান যেনা এক সুতোয় গাঁথা!

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ করে ১৯৫২ সালে। আর সেখানে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান হয় ১৯৬০ সালে। তুরস্কের গণতান্ত্রিক প্রথম নেতা আদনান মেন্দেরেসকে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করে সামরিক জান্তা। তখন টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি পশ্চিমা জোট! কেননা, প্রধানমন্ত্রী মেন্দেরেস তখন রাশিয়ার সাথে তার দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে ছিলেন!

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর ক-দিন আগে তুরস্কে আবার রাস্তায় ট্যাঙ্ক আর সামরিক বুটের শব্দ! নির্বাচিত সরকারকে জোড় করে উৎখাত করলো সামরিক জান্তারা!

১৯৮২ সালে আবার সামরিক অভ্যুত্থান। ১৯৯৭‌ সালের সংঘটিত হয় উত্তর আধুনিক সামরিক অভ্যুত্থান। ২০১৬ সালে নতুন সরকারের সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা। এছাড়াও ১৯৬১, ১৯৬২, ১৯৬৩, ১৯৬৯, ১৯৭৯, ২০০৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালানো হয়েছিলো!

সামরিক অভ্যুত্থানের নেপথ্যে কারা? এখন পর্যন্ত তুরস্কে যতো সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, সবগুলোর পিছনেই আমেরিকা তথা ন্যাটোর হাত ছিলো! আর এগুলো কখনোই পরোক্ষভাবে নয়; বরং একেবারে প্রত্যক্ষভাব! আমেরিকা সারা বিশ্বে গণতন্ত্র ফেরি করে বেড়ানোয় ওস্তাদ। বিশেষ করে, গণতন্ত্রীরা ক্ষমতায় থাকলে তো কথাই নেই। গণতন্ত্র ছাড়া যেনো তাদের টয়লেটই হয় না। অথচ সেই গণতন্ত্রের গডফাদার কিন্তু তুরস্কের কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কখনো কোনো টু শব্দটি করেনি, বরং সামরিক জান্তাকে বাহবা দিয়েছে প্রতিটি অভ্যূত্থানের পরে! যেমন- দেখুন, ২০১৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টাকালে তুর্কিরা ট্যাঙ্কের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছে গণতন্ত্রের জন্যে। সারা পৃথিবীর যেখানে এ গণতন্ত্রকামী জাতির পাশে দাঁড়ানোর কথা, গণতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন দেয়ার কথা, সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে সক্ষম হওয়ায় তুরস্ককে বাহবা দেয়ার কথা – সেখানে এই আমেরিকা এবং তার দোসররা উল্টো গণতান্ত্রিক সরকারকেই দোষারোপ করেছে! আর তখন থেকেই গণতান্ত্রিক সরকারকে অগণতান্ত্রিক উপায়ে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেই যাচ্ছে একের পর এক। এমনকি তারা সরাসরি ঘোষণা দিয়ে নামছে এরদোয়ান সরকারের বিরুদ্ধে। ছলে-বলে-কৌশলে যে কোনোভাবেই হোক – তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই হবে।

কারণ? আদনান মেন্দেরেস, তুরগুত ওয়াল, নাজিমউদ্দিন এরবাকান ও এরদোয়ানরা যখনই আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন, আমেরিকার আজ্ঞাবহ গোলামীর জিঞ্জির‌ ভেঙে বেড়িয়ে যেতে চেয়েছেন, দেশকে সাবলম্বী করার চেষ্টা করছেন – তখনই সামরিক বাহিনীক লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। কখনো গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে, কখনো মানবাধিকারের মুগুর দেখিয়ে, কখনো সমকামী স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে, কখনোবা মুক্ত বাণিজ্যের বেড়াজালে আবদ্ধ করে তুরস্ককে শিকল পরিয়েছে।

সুতরাং তুরস্ক যতোদিন এ শিকল পুরোপুরি ভেঙ্গে স্বকীয়তা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারবে – ততোদিন সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র চলতেই থাকবে। কখনো সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, কখনো অর্থনৈতিক হামলার মাধ্যমে, কখনোবা সন্ত্রাস লেলিয়ে দিয়ে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অবলম্বনে।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে