নারীদের দাম্পত্য জীবনের গল্প শুনতে চাইতো বর্মী সেনারা

0

আওয়ার টাইমস নিউজ।
মিয়ানমারে বন্দীশিবিরে আটক নারীদের দাম্পত্য জীবনের গল্প শুনতে চাইতো সেনারা! এছাড়া, নানাভাবে করা হতো যৌন হয়রানি। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে সেনা হেফাজতে নির্যাতনের রোমহর্ষক সব বর্ণনা দিলেন কয়েকজন নারী।

সেনা শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বহু নারীকে আটক করা হয়েছে। এরপর তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে! এমনকি পেটাতে পেটাতে অনেককেই মেরে ফেলেছে সেনারা! বিবিসির অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গণহত্যার মতো অপরাধ করছে মিয়ানমারের বর্বর সেনাবাহিনী। এসব মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছে বিবিসি। সর্বশেষ সোমবার ‘টরটার্চড টু ডেথ: মিয়ানমার ম্যাস কিলিং রিভিলড’ শিরোনামে বিশেষ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। এর আগে সেনাদের নারী নির্যাতন নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন করে বিবিসি।
সেনা অভ্যুত্থানের পরপরই আটক ৫ নারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ‘মিয়ানমার কু: দ্য উইমেন অ্যাবিউজড অ্যান্ড টরচার্ডড ইন ডিটেশন’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি চলতি মাসের প্রথম দিকে (৯ ডিসেম্বর) প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে নিজেদের ওপর ভয়াবহ ও নজিরবিহীন নির্যাতন ও নিপীড়নের বর্ণনা দেন ঐ নারীরা।

বিবিসির প্রতিবেদন মতে, আটকের পর বন্দিনীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে! অন্তত ৮ জন নারী সেনা হেফাজতে মারা গেছেন! এদের ৪ জনকে পেটাতে পেটাতেই মেরে ফেলা হয়েছে! এছাড়া, বহু নারীকে এমনভাবে পেটানো হয়েছে যে, তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে!

গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়ায় আটক হন অধিকারকর্মী এইন শোয়ে মাইকে। এরপর তাকে প্রায় ৬ মাস বন্দী রাখা হয়। সম্প্রতি দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার কারাবন্দীকে মুক্তি দেয় মিয়ানমারের জান্তা সরকার। তাদের মাঝে শোয়ে মাইও ছিলেন। বিবিসির সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন: আটকের পর, প্রথম ১০ দিন আমাকে রাখা হয় মিয়ানমারের কুখ্যাত এক বন্দীশিবিরে। এখানেই আমার ওপর অবর্ণনীয় যৌন নির্যাতন চালানো হয়! আটকের কয়েক ঘণ্টা পর আমাকে অজানা এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়! এরপর চোখ বেঁধে ফেলা হয়! তারপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। কয়েকজন অফিসার আমাকে একটার পর একটা প্রশ্ন করতে থাকে! আর আমি উত্তর দিতে থাকি। কোনো প্রশ্নের উত্তর পছন্দ না হলেই বাঁশ দিয়ে মাথায় আঘাত করা হতো! জিজ্ঞাসাবাদে সেনারা আমার দাম্পত্য ও যৌন জীবনের গল্প শুনতে চাইতো! এক প্রশ্নকর্তা আমাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললো – ’তুমি কি জানো এখানে আমরা নারীদের কী করি? আমরা তাদের ধর্ষণের পর মেরে ফেলি!’ এরপর চোখ বাঁধা অবস্থাতেই আমাকে যৌন হয়রানি করা হয়! ওরা আমার জামা ধরে টান দেয়! শরীর আলগা করে আমাকে বাজেভাবে স্পর্শ করে!

মিয়ানমারে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ-প্রতিবাদ আন্দোলন। চলমান এ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে নারীরা। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, শুরুতেই ঢালাও আটক-গ্রেফতার, গুম, হত্যা ও নির্যাতন-নিপীড়নকে আন্দোলন দমানোর কৌশল হিসাবে নেয় সেনাবাহিনী। তবে সময় যতো গড়িয়েছে – এর মাত্রা ততোই বেড়েছে! গণতান্ত্রিক আন্দোলন রোধ করতে পুরুষদের পাশাপাশি বহু নারীকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়! এরপর বন্দীশিবিরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাদের ওপর অকথ্য নিপীড়ন চালানো হয়!

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মিয়ানমার বিষয়ক গবেষক ম্যানি মং বলছেন: নারীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে সেনা ব্যারাক বা পরিত্যক্ত কোনো বাড়ীতে অস্থায়ী বন্দীশিবির গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বন্দীশিবিরে নারীদের একাকী আটকে রাখা হয়। মিস লিন নামে এক অধিকারকর্মী – কীভাবে তাকে ইয়াঙ্গুনের একটি বন্দীশিবিরে ৪০ দিনেরও বেশী সময় ধরে আটক রাখা হয় তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন: আমাকে অন্ধকার একটি ঘরে ফেলে রাখা হতো! সেখানে আমার মনে হতো – আমি মরে যাচ্ছি! মাঝে মাঝে কাছের অন্য ঘর থেকে চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেতাম! ভাবতাম – আমার মতোই হয়তো কাউকে পেটানো হচ্ছে!

স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজোনারস’র (এএপিপি) তথ্য মতে, বিক্ষোভে সেনাবাহিনীর অভিযানে ১,৩১৮ জন নিহত হয়েছেন – যাদের মাঝে অন্তত ৯৩ জন নারী। প্রতিবাদ করায় চলতি ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে ১০,২০০ জনের বেশী মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে! এদের মাঝে নারী দু হাজারের বেশী। গ্রেফতারের পর, এসব বন্দীর ওপর সেনা-পুলিশের ভয়াবহ নির্যাতন ও নিপীড়নের রিপোর্ট প্রায়ই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। লিঙ্গভেদে এসব নির্যাতনের ধরনও ভিন্ন হয়ে থাকে।

সূত্র: বিবিসি।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে