বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে ইরান ও ইসরাইলের ছায়াযুদ্ধ!

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের বৈরি দু দেশ ইরান ও ইসরাইলের মাঝে অনেক দিন ধরে চলা অঘোষিত ছায়াযুদ্ধ এখন উদ্বেগজনকভাবে যেনো তীব্র হয়ে উঠছে। ইরানের নাতাঞ্জেতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম পরিশোধনাগারে এ সপ্তাহান্তে যে রহস্যজনক বিস্ফোরণ হয়েছে, দেশটি এজন্যে ইসরাইলকে দায়ী করে এটা ‘নাশকতামূলক কাজ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। ইসরাইল এটার দায় স্বীকার না করলেও আমেরিকা ও ইসরাইলের সংবাদমাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা বলেছেন: ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়েছে।

ইরান বলেছে, তারা তাদের বেছে নেয়া যে কোনো সময়ে অবশ্যই এটার প্রতিশোধ নেবে। এটা কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দু দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বৈরি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের মাত্রা ক্রমশই বাড়িয়ে তুলছে। পুরো যুদ্ধ বাঁধলে, তা দু দেশের জন্যে ব্যাপক বিধ্বংসী হবে বলে, সেটা এড়িয়ে তলে তলে তাদের ঠাণ্ডা লড়াই আরো তীব্র করে তুলছে। এতে বিপদের ঝুঁকিগুলো কোথায় আর এর পরিণতিইবা কী হতে পারে?

এ ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র মূলত তিনটি –

১। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি: ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হবে বলে বারবার আশ্বাস দিলেও ইসরাইল তা বিশ্বাস করে না। ইসরাইল নিশ্চিত যে, ইরান গোপনে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করছে – যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য হবে।

সোমবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ইসরাইল সফরকালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন: ইরানের কট্টরপন্থী প্রশাসন যে হুমকি সৃষ্টি করছে, মধ্যপ্রাচ্যের জন্যে তা সবচেয়ে ভয়ানক, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি!

সেদিনই লন্ডনে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত যিপি হতোভেলি বলেছেন: ইরান কখনই পারমাণবিক অস্ত্র এবং তা ব্যবহারের জন্যে উপযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কর্মসূচি বন্ধ করেনি। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্য সারা বিশ্বের জন্যে একটা হুমকি।

এ বিশ্বাস থেকে ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে খোঁড়া করে দিতে বা বিলম্বিত করতে গোপনে একতরফা অঘোষিত তৎপরতা চালাচ্ছে। ইসরাইল স্টাক্সনেট সাংকেতিক নাম দিয়ে তৈরি কম্পিউটার ভাইরাস সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে – যা প্রথম জানা যায় ২০১০ সালে। ওটা ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের সেন্ট্রিফিউজ ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেয়! এ শতকের গোড়ার দিকে ইরানের বেশ ক-জন পরমাণু বিজ্ঞানী রহস্যজনকভাবে মারা যান এবং নভেম্বরে তেহরানের কাছে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মহসিন ফখরিজাদেহকে খুন করা হয়। মহসিন ফখরিজাদেহ যে শুধু ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন তাই নয়, তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও ছিলেন। ইসরাইলের বিশ্বাস ছিলো – ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সামরিক লক্ষ্যে গড়ে তোলার গোপন কার্যকলাপ তিনিই পরিচালনা করছিলেন। সেই কর্মসূচি এখন সম্ভবত একটা বিপজ্জনক পর্যায়ে আছে!

ইরান ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি পরমাণু চুক্তিতে সই করে – যার নাম ছিলো জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)। এরপর ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে আনেন এবং তেহরানের ওপর ফের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেন। ইরান এরপর ঐ চুক্তির শর্ত সময়ে সময়ে লঙ্ঘন করেছে। বিশেষ করে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। এভাবে উচ্চ মাত্রায় পরিশোধিত ইউরেনিয়াম পারমাণবিক জ্বালানির জন্যে যেমনি ব্যবহৃত হয়, তেমনি অস্ত্র তৈরিতেও তা ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকে।

ইরান চুক্তিটির শর্ত পুরোপুরি মেনে চলতে রাজি হলে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আমেরিকাকে আবারো এ চুক্তিতে ফিরিয়ে আনতে চান। ইরান বলছে, না; আমরা তোমাদের বিশ্বাস করি না। তোমরা আগে প্রতিশ্রুতি পূরণ করো। নিষেধাজ্ঞা আগে তুলে নাও। তারপর আমরা চুক্তির শর্ত পুরোপুরি মানবো।

এ অচলাবস্থা অবসানের চেষ্টায় বেশ কয়েকটি দেশের আলোচকরা ভিয়েনায় বৈঠক করেছেন। তবে এ চুক্তি বর্তমান আকারে পুনরুদ্ধারে যুক্তি কতোটা আছে, তা নিয়ে সন্দিহান ইসরাইল। লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ডঃ মাইকেল স্টিফেন্স বলেন: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভণ্ডুলের একটা চেষ্টা নিয়েই ইসরাইল সাম্প্রতিক কার্যকলাপ চালাচ্ছে।

মাইকেল স্টিফেন্স বলেন: ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট বা অকেজো করতে ইসরাইল একতরফা চেষ্টা চালাচ্ছে। কৌশলগত ক্ষমতার দিক দিয়ে তা চমকপ্রদ হলেও এটা একটা ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। প্রথমত, ইসরাইলের এ পদক্ষেপে আমেরিকার আলোচনায় বসার পরিস্থিতি বিঘ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে, আমেরিকা যখন ইরানের সাথে নতুন করে চুক্তির চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, ইরান বিশ্বব্যাপী ইসরাইলি স্বার্থজড়িত – এমন কিছুর ওপর এমন ধরনের হামলা চালাতে পারে – যা হবে অসম ক্ষমতার ভিত্তিতে এবং সেটি হয়তো খুব প্রচ্ছন্ন হবে না। ইরানের কর্মসূচি ইসরাইল যে ব্যাহত করতে পারে, তা তারা প্রমাণ করেছে। কিন্তু সেটার মূল্য কতোটুকুইবা?

২। নৌ চলাচল: সমুদ্রপথে সম্প্রতি রহস্যজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে! এ বছরের গোড়ার দিকে ইসরাইলি মালবাহী জাহাজ এমভি হেলিওস ওমান উপসাগর দিয়ে যেতে গিয়ে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়! জাহাজের মূল অংশে হঠাৎ দুটি বিশাল গর্ত দেখা যায় এবং ইসরাইল সাথে সাথে এজন্যে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে দায়ী করেছে! তবে তেহরানের দাবি, এতে তাদের কোন হাত ছিলো না।

এপ্রিলে দক্ষিণ লোহিত সাগরে নোঙর করা ‘সাভিজ’ নামে ইরানের একটি জাহাজের মূল অংশ কোনো কিছুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধারণা করা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তা হয়েছে। কাছের ইয়েমেনে সউদী নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ধারণা করছিলো – সাভিজ ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের জন্যে প্রধান সরবরাহি জাহাজ হিসেবে কাজ করছিলো। তাদের বক্তব্য ছিলো – ঐ মূল জাহাজটিতে স্পিডবোট, মেশিনগান ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম দেখা গেছে। কিন্তু ইরান বলছে, ঐ জাহাজটি কোনো সামরিক উদ্দেশে নয়, বরং শান্তিপূর্ণ ও বৈধ উদ্দেশে সেখানে নোঙর করা ছিলো। ইরান এ হামলার জন্যে ইসরাইলকে দায়ী করেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী গত ১৮ মাসে সিরিয়াগামী ইরানের তেল ও সামরিক সরবরাহ পরিবাহী ১২টি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

৩। সিরিয়া ও লেবানন: গত ১০ বছর ধরে সিরিয়ার সীমান্তের ভেতরে যুদ্ধ চলায়, সেখানে ইসরাইলের সামরিক তৎপরতার দিক থেকে নজর সরে গেছে। ঐ গৃহযুদ্ধে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে আইআরজিসি’র ইরানি বহু সামরিক উপদেষ্টা ইরানের লেবাননি মিত্র হিযবুল্লাহ’র সাথে একযোগে কাজ করেছে। কোনো কোনো সময় দেখা গেছে, ইরানি রেভুল্যশনারি বাহিনী সীমান্তের কাছে ইসরাইল অধিকৃত গোলান মালভূমিতেও হামলা চালিয়েছে।

ইসরাইলি শহরগুলোতে আঘাত হানার মতো দূরত্বে নির্ভুল নিশানায় ছোঁড়ার উপযোগী রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে ইরানের সক্ষমতা ইসরাইলকে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন করেছে! ইসরাইল সিরিয়ার ভেতরে ইরানের সামরিক ঘাঁটি ও সরবরাহ পথের ওপর অসংখ্য বিমান হামলাও চালিয়েছে। তবে তাতে এ পর্যন্ত ইরানের একেবারে পর্যুদস্ত হয়ে যাওয়ার মতো কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি!

উপসংহার: এ ছায়াযুদ্ধের পরিণতি হচ্ছে – পরিস্থিতি একেবারে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া। দু পক্ষের কেউই নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করতে চায় না। কিন্তু ইরান ও ইসরাইল – দু দেশই জানে, এমন পদক্ষেপ নেয়াটাই তাদের জন্যে বুদ্ধিমত্তা হবে – যেখানে একটা পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা তৈরি হবে না; কিন্তু উত্তেজনা একেবারে চরমে থাকবে। পারমাণবিক ক্ষেত্রে এটা পরিষ্কার যে, ইসরাইলের গোয়েন্দারা ইরানের নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করতে পারে। সেটা তারা এমন অভিনব কৌশলে করতে পারে – যা তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো! ইরান অভেদ্য নিরাপত্তা পদক্ষেপ নিলেও ইসরাইলিরা প্রমাণ করেছে যে, তাদের গুপ্তচররা ব্যক্তিগতভাবে সেই দুর্গে ঢুকে পড়তে পারে বা সাইবার জগতের নিরাপত্তা প্রাচীর ভেদ করে ইসরাইলের পদক্ষেপ নিতে সক্ষম।

নৌ চলাচলের ব্যাপারে ইসরাইলের জন্যে ভৌগোলিকভাবে কিছু অসুবিধা রয়েছে। ইসরাইলের এইলাতে দেশটির নৌবাহিনীর বন্দর থাকায় সেখান দিয়ে লোহিত সাগরে ঢোকার ভালো সুযোগ তাদের রয়েছে। তবে লোহিত সাগরের দূরবর্তী অংশগুলোতে তথা গালফ অঞ্চলে ইরানের দীর্ঘ উপকূল থাকায় এবং ইয়েমেনে হুথি মিত্রদের কারণে এক্ষেত্রে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

ইরান ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে সিরিয়া ও লেবাননে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে। কিন্তু সেটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ইসরাইলও তাদের জবাব কোন পথে যাবে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র যে ইরানকেই আঘাত করবে, সেটাও ইতোমধ্যে পরিষ্কার করে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশানাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস-এ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ জন রেইন বলেন: ইসরাইলের গোয়েন্দা সক্ষমতা যেহেতু অনেক উন্নত – সেহেতু এর অর্থ হবে ইরান হামলা চালালে সেটা হবে সাদামাটা ও প্রচলিত ধরনের হামলা। ইরান এর বাইরে উন্নত কৌশলের হামলা চালাতে পারবে না। ইসরাইলের ওপর হামলা চালাতে ইরানের সবচেয়ে বড় মিত্র হচ্ছে, হিজবুল্লাহ। এটি তেহরানের জন্যে কিছুটা হতাশার। কেননা, হিজবুল্লাহকে জড়িয়ে কোনো রকম বড় যুদ্ধে যাওয়া ইরান এড়াতে চায়। ইরানের বাড়তি কিছু সুবিধা থাকলেও ইসরাইলের সাথে সমান পাল্লায় লড়াইয়ের ক্ষমতা দেশটির নেই। ইসরাইল আরো দূর পাল্লায় আঘাত হানতে পারে, তাদের গুপ্তচরদের ইরানের ভেতরে গিয়ে সেখান থেকে দ্রুত কাজ করার দক্ষতা রয়েছে এবং প্রচলিত ধারায় হামলা চালাতে চাইলে, সেখানেও তারা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে। সূত্র: বিবিসি।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে