ভারতের মাদ্রাসাগুলোতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ পড়ানো হবে!

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
ভারতে মোদি সরকারের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির আওতায় শতাধিক মাদরাসায় বেদ, মহাভারত ও রামায়ণ সিলেবাসভুক্ত করা হচ্ছে! উল্লেখ্য, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ দু রকম – শ্রুতিভিত্তিক ও স্মৃতিভিত্তিক।

শ্রুতিভিত্তিক ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে, বেদ। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস মতে, বেদ ঈশ্বরের বাণী – যা প্রাচীন ঋষিরা ধ্যান করে তাঁর থেকে শুনে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু খোদ বেদের কোথাও এমন দাবি করা হয়নি, বরং তাতে বলা হয়েছে – একজন সূত্রধর যেমনি নিপূণভাবে রথ নির্মাণ করেন, তেমনই ঋষিগণ দক্ষতার সাথে বেদ গ্রন্থনা করেছেন। অবশ্য মহাভারতে ব্রহ্মাকে বেদের স্রষ্টা বলা হয়েছে।

স্মৃতিভিত্তিক ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে, মূলত বেদব্যাস-রচিত ‘মহাভারত’ এবং বাল্মিকী-রচিত ‘রামায়ণ’। তারা তাদের স্মৃতি থেকে এ মহাকাব্য দুটি রচনা করেছেন। রচনাকাল অজানা। এ ব্যাপারে বর্তমান পণ্ডিতরা অনুমান করে কিছু বলেছেন মাত্র। আর মহাকাব্য দুটির চরিত্রগুলোও কাল্পনিক। কেননা, সমকালীন কোনো ইতিহাস দ্বারা সেসব সমর্থিত বা প্রমাণিত নয়। বেদব্যাসের আসল নাম কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ণ। তিনি বেদকে বিন্যাস করেছেন বলে তাকে ‘বেদব্যাস’ বলা হয়। মহাভারত সবচেয়ে বড় মহাকাব্য। এটা আয়তনে হোমারের ‘ইলিয়ড’ ও ‘ওডিসি’ মহাকাব্য দুটির সম্মিলিত আয়তনের দশ গুণ এবং রামায়নের চার গুণ! এতে এক লাখ শ্লোক ও দীর্ঘ গদ্যাংশ রয়েছে। এটার শব্দ সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ! তবে বেদব্যাস প্রথমে ৮,৮০০ শ্লোকের ‘জয়া’ নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন। পরে তার শিষ্য বৈশম্পায়ন তা ২৪,০০০ শ্লোকে পরিবর্ধন করে নাম দেন ‘ভারত’। এরপর বেদব্যাসের আরেক শিষ্য উগ্রশ্রবাঃ ভারতকে এক লাখ শ্লোকে পরিবর্ধন করে নাম দেন ‘মহাভারত’। ‘গীতা’ মহাভারতের অংশ; যদিও তা একটি স্বতন্ত্র ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে। হিন্দুরা মনে করে, ‘গীতা’ ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী; যদিও খোদ গীতায় এমন দাবি করা হয়নি। যাহোক, হিন্দুরা গীতাকে শ্রদ্ধাভরে ‘ভগবদ্গীতা’ বা ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ বলে থাকে।

ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বশাসিত সংস্থা দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিং (এনআইওএস) নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়ন করছে। মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে এ পাঠ্যক্রম উন্মোচন করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিওয়াল। তিনি বলেন: আমাদের বেদ-পুরাণ-উপনিষদ যে সংস্কৃতির শিক্ষা আমাদের দিয়েছে, তা অমূল্য। এ সুফলকে আমরা মাদ্রাসাগুলোতে – এমনকি দেশের বাইরেও ভারতীয়দের কাছে ছড়িয়ে দিতে চাই। ফলে, এনআইওএসের এ পদক্ষেপকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।

এনআইওএসের চেয়ারম্যান সরোজ শর্মা জানিয়েছেন, আপাতত ১০০টি মাদরাসায় তৃতীয়, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যক্রমে থাকছে গীতা-রামায়ণ। ভবিষ্যতে ৫০০টি মাদরাসায় চালু হবে এ বিষয়ে পাঠদান। বর্তমানে ‘ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা’র উপর ১৫টি কোর্স তৈরি করা হয়েছে। এতে বেদ, যোগ, বিজ্ঞান, রামায়ণ, মহাভারত, সংস্কৃত ভাষা ও পাণিণির গাণিতিক সূত্র বিষয়ক পাঠ থাকবে।

তবে ভারতের শিক্ষাবিদদের অনেকেই এ পদক্ষেপের বিষয়ে চিন্তিত; এমনকি মাদরাসার শিক্ষকরা এর আসল মতলব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক অমরিন্দর আনসারী বলেছেন: প্রথমত, মাদরাসাগুলো কিন্তু সংগঠিত শিক্ষা খাতের ভেতরে পড়ে না। সেখানে একটা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির দেশে এ রকম কিছু চালু করতে গেলে, সেটা কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেয়া হিসেবেই দেখা হবে। মাদরাসাগুলোর স্বশাসনেরইবা কী হবে?

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৩৪ বছর পর, বদল আসে ভারতের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে। একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে কেন্দ্রের তরফ থেকে এ পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করা হয়। নতুন নীতিতে শিক্ষার অধিকারের আওতায় আনা হয়েছে ৩ থেকে ১৮ বছরের শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি বদল ঘটানো হয়েছে পরীক্ষা ব্যবস্থায়। এমনকি, আমূল বদলে গিয়েছে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাও। মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের নাম বদলে হয়েছে ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়’। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে এ নামেই পরিচিত ছিলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে গুরুত্বহীন দশম বা দ্বাদশ শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার বদলে হাতেকলমে শিক্ষায় জোর দেয়া হবে। প্রতি বছরের বদলে তৃতীয়, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে পরীক্ষা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। দশম শ্রেণীর পর, কলা বিভাগ, বিজ্ঞান বিভাগ ও বাণিজ্য বিভাগের তফাৎ উঠে যাচ্ছে। পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়লেও পাঠ্যক্রমে থাকতে পারে সঙ্গীত! পদার্থবিদ্যা, রসায়ন নিয়ে পড়লেও, ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়ার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা! যদিও বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নতুন নীতিতে শিক্ষাব্যবস্থা কুক্ষিগত করেছে মোদি সরকার। সূত্র: বিবিসি বাংলা, টিওআই ও অন্যান্য।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে