ভারতে প্রায় ১৫০ দিন কারাবন্দী মুসলিম এক সাংবাদিক!

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
গত বছর ১৪ই সেপ্টেম্বর ভারতে এক দলিত কিশোরীকে (১৯) প্রভাবশালী ঠাকুর সম্প্রদায়ের চার ব্যক্তির সংঘবদ্ধ ধর্ষণের খবর সংগ্রহে উত্তর প্রদেশের ছোট্ট শহর হাথরাস যেতে গিয়ে ২০২০ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার মুসলিম সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানের (৪১) কারা জীবনের ১৫০ দিন বা ৫ মাস পুরো হতে যাচ্ছে! ধর্ষণের প্রাক্কালে হামলায় ঐ কিশোরীর মেরুদণ্ডে বড় ধরনের আঘাত লাগে এবং নয়া দিল্লির একটি হাসপাতালে দু সপ্তাহ পর, সে মারা যায়! এ ঘটনায় ভারতজুড়ে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

হিন্দু জাত প্রথা অনুসারে, দলিতরা অস্পৃশ্য এবং সবার নিচে। শতাব্দীকাল থেকেই এরা পরিকল্পিত বৈষম্যের শিকার। ঐ ঘটনায় ক্ষোভ আরো বাড়ে – যখন প্রকাশ পায় যে, হাথরাস কর্তৃপক্ষ গোপনে ঐ কিশোরীকে তার পরিবারের অনুমতি ছাড়াই সমাহিত করেছে ৩০শে সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে! অভিযোগ রয়েছে, দাফনের সময় কিশোরীটির পরিবারকে পুলিশ তাদের বাড়ীতে বন্দী করে রাখে!

অনেক সাংবাদিক হাথরাস ছুটেন ঘটনার অগ্রগতি জানতে। মালায়লাম ভাষার নিউজ পোর্টাল আজিমুখাম-এর নিয়মিত প্রদায়ক সিদ্দিক কাপ্পান ছিলেন তাদের একজন। ৫ই অক্টোবর উত্তর প্রদেশের পুলিশ হাথরাসগামী একটি কার থেকে তাকে তুলে নেয়!

প্রথমে পুলিশ সিদ্দিককে জাতিগত দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টায় অভিযুক্তির চেষ্টা করে! পরে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী ও বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়! চার মাস পর, ভারতের এনফোর্স ডিরেক্টোরেট (ইডি) তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলাও করে!

শুরুতে এ মামলায় দায়িত্বরত উত্তর প্রদেশের এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা শ্রিষ চন্দ্র গ্রেফতারের সময় সিদ্দিক কাপ্পানের সাংবাদিক পরিচয় জানেন না বলে দাবি করেন! তিনি বলেন: শুরুতে বিষয়টি স্পষ্ট ছিলো না। সিদ্দিকও বলেননি এবং সাথে তার কোনো আইডি কার্ডও ছিলো না। নইলে, কেন আমরা তাকে থামিয়েছি – যখন সব সাংবাদিক সেখানে গিয়েছেন? আমরা একটি গাড়ীতে কয়েকটি জিনিসের ওপর শায়িত চার ব্যক্তিকে পাই। পরে আমরা পিএফআই সংশ্লিষ্ট কিছু লেখা ও নথি গাড়ী থেকে উদ্ধার করি।

পিএফআই বা পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া ভারতের মুসলিম একটি সংগঠন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এটির সাথে জিহাদ-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করে। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব অস্বীকার করে সংগঠনটি দাবি করে – তারা ভারতে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে।

পুলিশ বলছে, সিদ্দিকের সঙ্গে গ্রেফতার আরো তিন জনের দুজন পিএফআই’র ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাস ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া’র সদস্য।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে কেরালা ইউনিয়ন অব ওয়ার্কিং জার্নালিস্টস (কেইউডব্লিউজে)- এর আবেদনের শুনানিতে পুলিশ বলেছে, সিদ্দিক পিএফআই’র অফিস সেক্রেটারি এবং সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে কাজ করতেন।

২০১৯ সালে নয়া দিল্লির কেইউডব্লিউজে-এর সেক্রেটারি নির্বাচিত হন সিদ্দিক। গ্রেফতারের সময় তার সাথে প্রেস কার্ড না থাকার অভিযোগ খারিজ করেছে সংগঠনটি। সিদ্দিকের আইনজীবী উইলস ম্যাথুস বলেন: আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে মামলাটি মিথ্যে তথ্যে ভরা। সিদ্দিকের পিএফআই’র অফিস সেক্রেটারি হওয়ার কোনো প্রমাণ পুলিশ আদালতে দাখিল করতে পারেনি। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। গ্রেফতারের পর, এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। কেন অতিরিক্ত এফআইআরে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হলো?

আদালতে দাখিল নথি মোতাবেক, সিদ্দিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ জামিনযোগ্য। কিন্তু পরে যেসব গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো জামিন অযোগ্য। ফলে, তাকে কাস্টডিতে রাখতে পারছে পুলিশ।

এ মাসের শুরুতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাকে পাঁচদিনের অন্তবর্তীকালীন জামিন দিয়েছে তার মুমূর্ষু মাকে দেখতে যেতে। তখন তার সাথে একজন রাইডার ছিলেন এবং তাকে মিডিয়ার সাথে কথা বলতে দেয়া হয়নি!

সিদ্দিকের স্ত্রী রায়হানাথ কাপ্পান বলেন: মুসলিম ও মালায়লি হওয়ায়ই আমার স্বামীকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তাকে নির্যাতনও করা হয়েছে। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছে – তিনি গরুর গোশত খেয়েছেন কিনা এবং ডঃ জাকির নায়েককে দেখেছেন কিনা? তাকে আরো জিজ্ঞেস করা হয়েছে – দলিতদের প্রতি মুসলিমদের এতো সহানুভুতি কেন। সূত্র: আল-জাজিরা

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে