যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া এখন কার নিয়ন্ত্রণে?

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট:সাইফুল ইসলাম
আওয়ার টাইমস্ নিউজ: ১৯৭০ সালে সিরিয়ায় ক্ষমতায় এসে আসাদ পরিবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো – ফিলিস্তিন, লেবানন, জর্দান ও সিরিয়া নিয়ে এক সময়ের বৃহত্তর সিরিয়া পুনরুদ্ধারের। আরব বাথ বা রেনেসাঁয় নেতৃত্ব দেয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলো তারা। ২৬ মে কথিত নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে আরো সাত বছরের জন্যে ক্ষমতায় থাকতে চলেছেন বাশার আল-আসাদ। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে সিরিয়ার যে বিশাল অঞ্চলের শাসনভার পেয়েছিলেন তিনি, ইতোমধ্যে তার অনেকটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে এ নেতার। তাই, প্রশ্ন উঠছে – তাহলে সিরিয়া এখন কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

১৯৩৬ সালে ফ্রান্সের সাথে স্বাধীনতা চুক্তির পরপরই ভূমি হারাতে শুরু করে সিরিয়া। ১৯৩৯ সালে ইস্কেন্ডারুনবাসী তুরস্কের সাথে যোগ দেয়ার পক্ষে ভোট দেন। ১৯৬৭ সালে গোলান মালভূমির প্রায় পুরোটাই দখল করে নেয় ইসরাইল। তবে ২০১১ সালে সিরীয় বিপ্লবের সাথে তুলনা করলে এসব ক্ষতি আসলে কিছুই নয়। তখন দামেস্কের প্রাণকেন্দ্রে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে সিরিয়ার বেশিরভাগ এলাকা থেকে সরকারি বাহিনী সরিয়ে নেয়া হয়। ফলে, খুব সহজেই ঐসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে। ২০১৪ সালে ফোরাত উপত্যকাসহ ইরাক সীমান্তবর্তী তেলক্ষেত্রগুলো দখল করে আইএস। বলা হয়, সবচেয়ে দুরাবস্থা চলাকালীন তখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিলো গোটা দেশের মাত্র ৩০% এলাকা।

আজকের সিরিয়া মূলত চারটি বড় ছিটমহলে পরিণত হয়েছে – যার প্রত্যেকটিতে নিজস্ব আধিপত্যবাদী জাতি বা গোষ্ঠী, সশস্ত্র বাহিনী ও মুদ্রা রয়েছে। আসাদের সম্প্রদায় আলাওরা এখনো সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। তারা আলেপ্পো থেকে দারার মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু সেগুলো ধ্বংস করে। সব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, আসাদ সমর্থকরা এখন সিরিয়ার প্রায় ৬০% শাসন করছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন একটি জোট আইএস’কে পরাস্ত করে এবং তারা যেসব তেলক্ষেত্র ও উত্তর-পূর্বের এলাকার দখল নিয়েছিলো, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ কুর্দিদের হাতে তুলে দিয়েছে। তবে সিরিয়া সরকারের পাল্টা আক্রমণে পালিয়ে যাওয়া সুন্নি যোদ্ধাদের জন্যে নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলেছে তুরস্ক। এটি ইদলিবসহ উত্তর-পশ্চিমে বহুদূর এগিয়েছে – যেখানে হায়াত তাহরীর আশ-শাম নামে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শাসন চলছে। জর্দানের সমর্থনপুষ্ট সিরীয় বিদ্রোহীরা দক্ষিণের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। আর পূর্বের কিছু এলাকায় এখনো আইএসের প্রভাব রয়েছে।

বাশার আল-আসাদ বলেছেন যে, তিনি সিরিয়ার প্রতি ইঞ্চি জায়গার দখল ফিরে পেতে চান। তবে তিনি সম্ভবত সামর্থ্যের শেষসীমায় পৌঁছে গেছেন। সিরিয়ার প্রত্যেকটি বিভক্ত অঞ্চলের অন্তত একটি করে বিদেশী রক্ষক রয়েছে। আসাদ পরিবারকে ডিঙিয়ে রুশ, মার্কিন, তুর্কি ও ইরানিরা সিরিয়ার স্থিতিশীলতা সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছে – যার মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ফলে, পাঁচ বছর আগে যেখানে দৈনিক ২০০ হামলা হতো – এখন তা মাসে ৪০টিতে দাঁড়িয়েছে।

তবে এর মাঝেও কঠিন চাপে রয়েছেন আসাদ। তার দেশ এতোটাই দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে যে, দক্ষিণে ড্রুজ উপজাতি এবং পূর্বে আরবরা নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সিরীয় রাজধানীর বাইরে রুশ বাহিনীর পদযাত্রা অচিহ্নিতই থেকে যাচ্ছে। ইরান ও এর ছায়া যোদ্ধারা লেবাননের পূর্বভাগ এবং ইরাকের পশ্চিমে সীমান্ত অঞ্চলগুলোর বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। আর ইসরাইল তো নির্বিচারে বোমা মেরে চলেছে; অর্থাৎ সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো আসাদ পরিবার, সেক্ষেত্রে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে