রাশিয়ার যুদ্ধ-বিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল ইসরাইল! তুরস্কও চুপ থাকবে না: এরদোয়ান

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
গাজায় ইসরাইলের বর্বর সামরিক আগ্রাসন থামাতে প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়ে রাশিয়া বলেছে, মিশরের নজরদারিতে এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। কিন্তু ইসরাইল তা প্রত্যাখ্যান করেছে; আর হামাস বলেছে: যুদ্ধবিরতি শুধু গাজা উপত্যকায় পালন করলে চলবে না, বরং এতে জেরুজালেমের আল-কুদস শহরকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেখানেও ইসরাইলের ঘৃণ্য হামলা বন্ধ করতে হবে। তবে তুরস্ক বা কাতারে নির্বাসিত হামাসের অন্যতম নেতা সালেহ আল-আরুরী বলেছেন: মিশর, কাতার ও জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির জোরদার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে, আজ এক অনলাইন ব্রিফিংয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন: ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি নিপীড়নের বিষয়টি সারা পৃথিবী এড়িয়ে গেলেও তুরস্ক চুপ থাকবে না। ফিলিস্তিনিদের ওপর সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের হামলার ঘটনায় আমি ভারাক্রান্ত ও ক্ষুব্ধ। ফিলিস্তিনের শহরগুলোতে ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ও মানবতার সম্মান রক্ষায় জেরুজালেমের পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। যারা চুপ করে থেকে অথবা প্রকাশ্যে ইসরাইলের রক্তপাতকে সমর্থন করে, জেনে রাখা উচিত – একদিন তাদের ফিরতে হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের কর্তব্য জেরেুজালেমে শান্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিশ্চিত করা।

ওদিকে, ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চারদিন আগে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের শুরু করা ‘সোর্ড অব কুদস’ সামরিক অভিযান ইসরাইলের জন্যে মারাত্মক হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও অবকাঠামো ধ্বংস করলেও এ যুদ্ধ ইসরাইলের জন্যেও খুব খারাপ পরিণতি ডেকে আনবে এবং এটাকে ইসরাইলের জন্যে বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছেন তারা।

ইসরাইলের প্রথম বিপদ হচ্ছে, ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রথম দফা হামলায় গাজা থেকে ইসরাইলের দিকে বহু রকেট ছুঁড়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে – মঙ্গলবার ফিলিস্তিনিরা ১৫০০টির বেশি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের দিকে ছুঁড়েছে। হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জাদ্দিক আল-কাস্সাম ব্রিগ্রেডের মুখপাত্র আবু আবিদী বলেছেন: হামাস দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তাঁর এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায় – তাদের প্রচুর রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের রয়েছে; যদিও ২০০৬ সাল থেকে ইসরাইল গাজার ওপর সর্বাত্মক অবরোধ দিয়ে রেখেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সত্বেও গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধারা সামরিক খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে – যা ইসরাইলের জন্যে বিরাট হুমকি!

ইসরাইলের দ্বিতীয় বিপদ হচ্ছে, এ পর্যন্ত আট জন ইসরাইলি নিহত হয়েছে, বহু ইসরাইলি আহত হয়েছে এবং অনেকেই মাটির নীচে আশ্রয় শিবিরে গা ঢাকা দিয়ে আছে। এ থেকে বোঝা যায় – ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা আয়রন ডোম ফিলিস্তিনিদের সব রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারছে না। ফলে, দুদিক থেকে আয়রন ডোমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে, ফিলিস্তিনিদের শতশত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে তাদের অক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, আয়রন ডোমের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলে সাধারণ ইসরাইলিদেরকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। ইসরাইলি সাময়িকী ‘ইসরাইল হাইয়ুম’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি আয়রন ডোম তৈরিতে ৮০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা প্রথম দিকে কম দামের রকেট ছুঁড়ও সেটা ঠেকাতে গিয়ে ইসরাইলকে ৮০ হাজার ডলার মূল্যের আয়রন ডোম ব্যবহার করতে হচ্ছে! ফলে, এ যুদ্ধে ইসরাইলের আর্থিক ব্যয় হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের চেয়ে বেশি। ইসরাইলের এ ক্ষতি বাড়াতেই মূলত আল-আকসা টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর উপ-প্রধান সালেহ আল-আরুরী বলেছেন: এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত সকল ক্ষেপণাস্ত্র পুরানো ছিলো এবং মূল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখনো ব্যবহার করা হয়নি।

ইসরাইলের তৃতীয় বিপদ হচ্ছে, অতীত যুদ্ধ কৌশলের চেয়ে এবার ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা আরো বেশি শক্তিমত্তা দেখাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিমান বন্দরগুলোতে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হামলা চালানো থেকে বোঝা যায় তারা এখন আর আগের মতো দুর্বল নয়। ঐ হামলায় ইসরাইলের বেন গুরিয়ান বিমান বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। রামুন বিমানবন্দরও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে ইসরাইল।

ইসরাইলের চতুর্থ বিপদ হচ্ছে, ইসরাইলের ভেতরে সামাজিক সংকট ও বিভেদ চরম আকার ধারণ করেছে। আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোনো দিক থেকেই ইসরাইলিদের মাঝে একতা নেই। কেননা, বেশিরভাগ ইহুদি বিভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে জড়ো হয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানসিকতার কারণে সামাজিক সংকটও এখানে প্রবল।

ইসরাইলের পঞ্চম বিপদ হচ্ছে, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা। মার্চে নির্বাচনের পর, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ২৮ দিনের ভেতরে সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন। এরপর প্রেসিডেন্ট ইয়ের লাপিদকে সরকার গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সরকার গঠনের কাছাকাছি অবস্থায় চলে গেলেও চলমান যুদ্ধ সরকার গঠনে বাধা সৃষ্টি করবে। সে কারণে নির্বাচন ফের পঞ্চম দফায় গড়াতে পারে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন: ক্ষমতায় টিকে থাকতেই নেতানিয়াহু বর্তমান যুদ্ধ শুরু করেছেন। এ যুদ্ধ ইসরাইলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও অচলাবস্থা তৈরি করেছে। তবে এতে কেবল নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জিত হবে। এখন তিনি আসলে কতোটা লাভবান হতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।

সোমবার থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ১১৯ ফিলিস্তিনি শহীদ এবং প্রায় হাজার খানেক আহত হয়েছেন। শহীদদের মাঝে ৩১টি শিশুও রয়েছে। আর ৪ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী। এছাড়া, এ ছাড়া গাজার অন্তত ৩১টি স্কুল ও একটি স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী। অন্যদিকে, ইসরাইলের এক সেনাসহ ৮ জন নিহত হয়েছে। সূত্র: আল-কুদস চ্যালেন, আল-জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি ও পার্সটুডে।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে