রাশিয়া-তুরস্ক ভ্রাতৃত্ব: বৈশ্বিক রাজনীতির নয়া মেরুকরণ!

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ৩০ টি দেশ নিয়ে গঠিত সামরিক সংস্থা ন্যাটোর বিরুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনকে উৎখাত চেষ্টার অভিযোগ এনেছে ক্রেমলিন । তবে ন্যাটোর্ভুক্ত এবং ইইউ’র সদস্য-প্রার্থী একমাত্র তুরস্কের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা ক্রেমলিনের। রাশিয়া ও তুরস্কের মাঝে ভিন্ন সময়ে ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহিংস সংঘর্ষ থাকলেও তারা পরস্পরের সাথে অপ্রতাশ্যিতভাবে একটি গভীর সম্পর্ক গড়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের মাঝে ভাতৃত্বের নয়া বন্ধন বৈশ্বিক রাজনীতিকে পুনর্র্নিমাণ করছে এবং বর্তমানে তুরস্কের পশ্চিমা মিত্রদের জন্যে কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুতিন অক্টোবরে ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের বলেছেন: এমন অংশীদারের সাথে কাজ করা কেবল আনন্দদায়কই নয়, নিরাপদও বটে।

এরদোয়ান পুতিনের প্রশংসার প্রত্যুত্তরে রাশিয়া থেকে যে এস-৪০০ কিনেছিলেন। এটির পরীক্ষামূলক নিক্ষেপ করে পুতিনকে সালাম জানান। নভেম্বরে তারা দক্ষিণ ককেশাসে তুরস্ককে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সুবিধা প্রণয়ন করে এবং নাগোর্নো-কারাবাখে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে মুখোমুখি যুদ্ধের অবসান ঘটান। এটা শীতল যুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক আলোড়ন তোলা চুক্তি!

এ তুরস্ক-রাশিয়া চুক্তি শক্তির কৌশলগত ব্যবহার এবং একটি বহুমাত্রিক বিশ্বের বাস্তবতা সম্পর্কে বার্তা বহন করে। আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী থাকা সত্ত্বেও সিরিয়ার যুদ্ধে তার জড়িত হওয়ার অনীহা রাশিয়া ও তুরস্ককে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটির দায়িত্বে আবদ্ধ করে। রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রধান আন্দ্রে কর্তুনভ বলেছেন: তারা উভয়ই বোঝেন যে এখানে শক্তির ভারসাম্য নয়, বরং তা ব্যবহারের প্রস্তুতিটি গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে বৈরি এ দুদেশের সম্পর্কটি কীভাবে বদলে গেল? এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ২০১৬ সালের গ্রীষ্মে – যখন তুরস্কে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে প্রায় ২ শ জন নিহত হয়। তখন বেশিরভাগ পশ্চিমা নেতা প্রতিক্রিয়া জানাতে সময় নিলেও পুতিন তাৎক্ষণিকভাবে ফোন করে তুর্কি প্রেসিডেন্টকে সমবেদনা জানান। তুরস্কের এক মুখপাত্র বলেছেন: লোকটিকে পছন্দ হোক বা না হোক – তিনি সংহতি জানানোর মতো যথেষ্ট বিচক্ষণ ছিলেন।

এরপর এরদোয়ান রাশিয়া সফর করেছেন। সেখানে তিনি গ্যাস-পাইপলাইন চুক্তি করেছেন এবং দক্ষিণ তুরস্কে রাশিয়ার পারমাণবিক কেন্দ্রের কাজ পুনরায় শুরু করতে রাজি হয়েছেন। ইস্তাম্বুলের মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ এমের এরসেন বলেন: ন্যাটো তুরস্কের পাশে না দাঁড়ানোয় তুরস্ক বুঝতে পেরেছিলো যে, সিরিয়ায় তার স্বার্থ নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় রাশিয়ার সাথে চুক্তি। সে চুক্তি এখনো বহাল রয়েছে।

২০১৬ সাল থেকে এরদোয়ান পুতিনের সাথে অন্য নেতাদের থেকে বেশি মুখোমুখি বৈঠক করেছেন। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তুরস্কের প্রতিপক্ষ রাশিয়া হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুরস্ক শুধু রাশিয়ার সম্মতিতে উত্তর সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পেরেছে। ইতোমধ্যে রাশিয়ান বার্তাসংস্থাগুলো তুরস্কে জায়গা করে নিয়েছে। এরদোয়ানের অভ্যন্তরীণ গণ্ডিতে এখন ‘ইউরেশিয়াবাদী’ একটি দল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে – যারা রাশিয়া ও চীনকে সহযোগিতার জন্যে উন্মুক্ত এবং ইউরোপ ও ন্যাটোর বিষয়ে বৈরী।

পুতিন অঞ্চলটিতে মধ্যস্থতাকারী ও শান্তিরক্ষীর ভূমিকায় আবির্ভূত হতে পেরেছেন। তুরস্ক এ অঞ্চলে প্রতিপত্তি অর্জন করেছে এবং আর্মেনিয়া হয়ে বাকুতে পরিবহণ করিডোরের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে – যা চীনের বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ হতে পারে। এখানে পশ্চিমাদের কিছুই অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তুরস্ককে রাশিয়ার সাথে আবদ্ধের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগও ভূমিকা রেখেছে। রাশিয়ার সাথে তুরস্কের ১৩.৪ বিলিয়ন ডলার বানিজ্য ঘাটতি রয়েছে। তবে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মাঝে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমাপ্ত প্রকল্পগুলো নিয়ে তুরস্কের ঠিকাদারদের জন্যে রাশিয়া ছিলো শীর্ষস্থানীয় বাজার। পুতিনের জন্যে এটি একটি নতুন বহুমাত্রিক আধিপত্যের প্রদর্শনী এবং আমেরিকার আধিপত্যকে সীমাবদ্ধের প্রয়াস।

তুরস্ক ও রাশিয়া ইউরোপ থেকে বাদ পড়ায় একই ধরনের তিক্ততা পোষণ করে। তুরস্ক-ইউক্রেনের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরো জোরদার হওয়ার এটি অন্যতম কারণ। ২০১৯ সালে তুরস্ক ইউক্রেনে তার ৬টি জঙ্গীবিমান বিক্রি করেছে – যা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর জন্যে এই প্রথম ক্রয়। বর্তমানে তুরস্ক ক্রমশ পশ্চিমা জোট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া একটি দেশ। তবে রাশিয়ার সাথে এর অংশীদারিত্ব একই সাথে ভাতৃত্বপূর্ণ ও বিপরীতমুখী। এরসেন বলেছেন: রাশিয়া ও তুরস্ক যেখানে সম্ভব, সেখানে ঐকমত্যের জায়গা খুঁজবে। তবে বিশেষত কৃষ্ণসাগর ও ককেশাস – যেখানে রাশিয়ার চেয়ে তুরস্কের অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর আরো কাছাকাছি – সেখানে তাদের স্বার্থের ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হবে।

তবে বিশ্ব রাজনীতির রূপরেখা পরিবর্তনকারী তুরস্ক-রাশিয়া জোট ঠেকাতে পশ্চিমাদের সাথে তুরস্ককের দূরত্ব নিরসন এবং দেশটিকে পুতিনের বাহুমুক্ত করাকে অগ্রাধিকারে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট ও ইন্টারনেট।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে