আওয়ার টাইমস নিউজ।
সম্পাদকীয় কলামঃ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যখন ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছিল, তখন বিশ্বের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর একটি বড় অংশ প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রচার করছিল যে, মার্কিন-ইসরাইল জোট খুব দ্রুত ইরানকে সামরিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলবে। এবং অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও বলেছিলেন, ইরানের বিপ্লবী সরকার বেশিদিন টিকবে না, খুব শীঘ্রই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে পশ্চিমাপন্থী নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করবে।
ঠিক সেই সময়ই আমি “আওয়ার টাইমস নিউজ”-এ একটি মার্কিন-ইসরাইল জোটের সাথে ইরানের যুদ্ধ বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কলাম লিখেছিলাম। সেখানে আমি স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, “ইরানকে পরাজিত করা মার্কিন ইসরাইল জোটের জন্য অনেক কঠিন হবে, এবং প্রায় অসম্ভব।” আজ সময়ই প্রমাণ করছে, আমার সেই বিশ্লেষণটি আবেগনির্ভর ছিল না; বরং ভূ-রাজনীতি, সামরিক বাস্তবতা, আদর্শিক প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই আমি সেই অবস্থান নিয়েছিলাম।
কারণ আমি বুঝেছিলাম, এই যুদ্ধ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলার যুদ্ধ নয়। এটি ছিল ধৈর্যের যুদ্ধ, কৌশলের যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার যুদ্ধ এবং সবচেয়ে বড় কথা, জাতীয় আত্মমর্যাদা রক্ষার যুদ্ধ। বিশ্বের বহু শক্তিশালী রাষ্ট্র ইতিহাসে অস্ত্রের আঘাতে নয়, বরং ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবসময় আলাদা ছিল, তারা বহু বছর ধরেই নিজেদের “অবরুদ্ধ রাষ্ট্র” হিসেবে প্রস্তুত করেছে। নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক চাপ, গোয়েন্দা তৎপরতা, অর্থনৈতিক অবরোধ,এসবের মধ্যেই তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখার কৌশল শিখেছে।
যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো প্রতিদিন ইরানের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করছিল, তখন আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, যে রাষ্ট্র চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে আছে, তাকে কি এত সহজে ধ্বংস করা সম্ভব?
আজ নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। এমনকি বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এই চুক্তিকে নিজেদের কৌশলগত বিজয় হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারছে। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে, যদি ইরান সত্যিই সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়ত, তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে ফিরত? যে ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুদিন আগেও “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” ছাড়া কোনো সমঝোতার কথা মানতে রাজি ছিলেন না, আজ সেই যুক্তরাষ্ট্রকেই সমঝোতার ভাষায় কথা বলতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটিই বড় বাস্তবতা, যে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মাথা নত না করে টিকে থাকে, শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবেও সে-ই সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে যায়।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ইরানের বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করার যে স্বপ্ন পশ্চিমা জোট দেখছিল, সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের হত্যা, অর্থনৈতিক চাপ, সাইবার হামলা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা, কিছুই ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোকে ধসিয়ে দিতে পারেনি।
বরং ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি থাকলেই সব যুদ্ধ জেতা যায় না। মনোবল, আত্মত্যাগ, কৌশলগত অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতিও একটি রাষ্ট্রকে অদম্য করে তোলে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটকে কেন্দ্র করে ইরান যে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করেছে, সেটি পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তাদের অবস্থান এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আমি এটিও স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যুদ্ধ কখনোই মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়। এই সংঘাতে সাধারণ মানুষ কষ্ট পেয়েছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বহু পরিবার ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় কখনো কখনো একটি রাষ্ট্রের জন্য “সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়াই” বড় বিজয়ে পরিণত হয়।
আজ মুসলিম বিশ্বের জন্যও এই যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করছে। বিভক্ত, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে বুঝতে হবে, শুধু আবেগ দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামরিক প্রস্তুতি এবং জাতীয় ঐক্য ছাড়া সম্মান আদায় করা অসম্ভব।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ
“তোমরা তোমাদের সাধ্যানুযায়ী শক্তি প্রস্তুত করো।”
সূরা আল-আনফাল: ৬০
পবিত্র কুরআনের এই আয়াত কেবল যুদ্ধের আহ্বান নয়; বরং প্রস্তুতি, আত্মনির্ভরতা ও প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলার শিক্ষা।
আজকের বাস্তবতা অন্তত এটুকু প্রমাণ করেছে, ইরানকে ভয় দেখিয়ে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কিংবা সামরিক চাপ সৃষ্টি করে সহজে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না। যুদ্ধের শুরুতেই আমি বলেছিলাম, মার্কিন-ইসরাইল জোট ইরানকে পরাজিত করতে পারবে না। আজ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বাস্তবতা ধীরে ধীরে সেই কথার দিকেই ইঙ্গিত করছে। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি সৃষ্টিকর্তারের উপর ভরসা করে নিজের আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে শেখে, সেই জাতিকে পরাজিত করা কখনোই সহজ নয়।