ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আলেমদেরকে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

0

স্টাফ রিপোর্টার: মুহাম্মাদ উজ্জ্বল খান

আজ শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০ টায় নারায়ণগঞ্জস্থ শিবু মার্কেটের আইএসসিএ মিলনায়তনে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার উদ্যোগে শাখার সভাপতি শিব্বির আহমাদ এর সভাপতিত্বে ও কওমী মাদরাসা বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মাদ আবু রায়হান এর সঞ্চালনায় “নবীন আলেম সংবর্ধনা ২০২০” অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল্লামা শাহ আহমাদ শফী (দা.বা.) এর অন্যতম খলিফা আল্লামা মুফতি উমর ফারুক সন্দ্বীপী।
প্রধান অতিথি আল্লামা মুফতি উমর ফারুক সন্দ্বীপী তার বক্তব্যে বলেন, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন। মায়ের গর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্ম নেয়। ইসলাম মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৈৗমত্ব রক্ষার জোরালো তাগিদ দিয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেয়া পৃথিবী ও তার মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ নবী কারীম (সা.) হিজরতের পর মদীনার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য গঠণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

সময়ের ধারাবহিকতায় ১৯৭১ সালে মাতৃভূমি রক্ষার জন্যে পরাধীনতার হাত থেকে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নয় মাস রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জিত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা আমাদের এ অমূল্য স্বাধীনতা অর্জনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেন তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মাতৃভূমি রক্ষায় যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁরা মহান। তাঁরা দেশ ও জাতির গৌরব। সকল সংগ্রাম ও আন্দোলনে আলেম সমাজের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, যাঁদের শ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়ে ইংরেজ বেনিয়াদের এদেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন, যাঁরা শত্রুর হাত থেকে এদেশকে রক্ষা করেছিলেন; তাদের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে আজ অনেকটাই অজানা।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলার সংগ্রামী সভাপতি মাওলানা আনোয়ার হোসেন জিহাদী। বিশেষ অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে বংলাদেশের আলেম সমাজের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। এ দেশের মুক্তিকামী জনগণ একমাত্র মাতৃভূমির টানে, দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে এবং নির্যাতিত নিষ্পেশিত মা-বোনদের ইজ্জত সম্মান রক্ষার্থে পাকিস্তানী হানাদারদের লালসার হাত থেকে রক্ষার জন্যেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেরই অংশগ্রহণ ছিল তা ঠিক নয় বরং স্বাধীনতা সংগ্রামে এ দেশের আলেম সমাজ এবং সাধারণ জনগণের সংশ্লিষ্টতা অনস্মীকার্য। আমরা বলতে পারি সকল স্বাধীনতা সংগ্রামের ন্যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদেশের আলেম সমাজের ভূমিকা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ছিল। তাই বর্তমানের নবীন আলেম সমাজকে বলবো যদি আপনাদের ভিতরে দেশপ্রেম না থাকে, দেশের মানুষের প্রতি দরদ না থাকে, দেশকে নিয়ে যদি আপনার কোনো চিন্তাভাবনা না থাকে তাহলে আপনি আলেম হবেন বটে কিন্তু আপনার এই এলেম দেশ ও দশের কোনো কাজে আসবে না।

প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন এর মুহতারাম কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুল জলিল।
প্রধান বক্তা মুহাম্মাদ আব্দুল জলিল তার বক্তব্যে বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেম সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সত্য ইতিহাস দৃশ্যপটে আনলে আমরা এমন এক ব্যক্তিকে দেখতে পাই, যাকে বাংলাদেশ স্বাধীনতার মুল স্বপ্নদ্রষ্টা বলা যেতে পারে। তিনি হলেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভায় মাওলানা ভাষানী তাঁর ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি না দিলে দেশে ‘ফরাসী বিপ্লব’ করার হুমকি দেন।
মাওলানা শামছুল হুদা পাঁচবাগী পাকিস্তান প্রস্তাব (১৯৪৩)-বিরোধী এবং স্বাধীন বাংলার প্রবক্তা ছিলেন। ১৯৭০-৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনের সময় মাওলানা পাঁচবাগী মুক্তিকামী জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেন। পাকবাহিনীর হাত থেকে অনেকের জীবন রক্ষা করেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি তাঁর বাড়ি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার হিন্দু পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। গফরগাঁও এবং কিশোরগঞ্জের মানুষের মুখে মুখে এখনও যা কিংবদন্তি হয়ে আছে।
‘অমর বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমান যিনি ছিলেন ধর্মমন্ত্রণালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনিই প্রথম ষাটের দশকে ‘স্বতন্ত্র ধর্মদপ্তর’ একটি জাতীয় প্রয়োজন’বই লিখে বহুকাঙ্খিত স্বপ্নের জানান দেন। বহু আলেম-ওলামা যখন পাকিস্তান ও ইসলামকে একীভূত করে দেখেছিলেন আর পূর্বপাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকে এদেশ থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে বলে ভাবতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তে অসংখ্য আলেম-ওলামার মধ্য থেকে বের হয়ে এসে বীরবিক্রমে তিনি স্বাধীনতার ও স্বাধিকারের স্বপক্ষে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনিই একমাত্র আলেম, যিনি ‘শরিয়তের দৃষ্টিতে ৬ দফা’ বই লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। হিংস্র হানাদারদের হাতে বন্দি হবার ক’দিন আগে শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান ছন্দ এঁকেছিলেন এভাবে-
আমায় তোরা দিস গো ফেলে হেলা ভরে পথের ধারে
হয়তো পথিক করবে দোয়া দেখবে যখন কবরটাকে।
১৯৭২ সালে প্রণীত বুদ্ধিজীবী তালিকায় মাওলানা অলিউর রহমানের নাম থাকলেও মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বুদ্ধিজীবী নামের তালিকায় তাঁর নাম নেই।
১৯৭১ সালে মুফতী আমীমুল ইহসান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ফতওয়া দিয়েছিলেন। ফলে ইয়াহিয়া সরকার তাঁকে জোর করে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে এলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিব হিসেবে নিযুক্ত করেন।
১৯৭১ সালে মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এদেশের মজলুমদের এগিয়ে আসতে জাতির উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘এ যুদ্ধ ইসলাম আর কুফুরের যুদ্ধ নয়, এটা জালেম আর মজলুমের যুদ্ধ- পাকিস্তানিরা জালেম’। এ দেশের নিরীহ মানুষ ছিল মজলুম। সুস্থ বিবেক সম্পন্ন কোনো মানুষ জালেমের পক্ষাবলম্বন করতে পারে না। মজলুমকে সাহায্য করা, তার পক্ষে কথা বলা এটাই বিবেকের দাবি।
১৯৭১ সালে মাওলানা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী যিনি সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি বলেন- ‘আমি তখন হাফেজ্জী হুজুর এবং শায়খুল হাদীস মাওলানা আজিজুল হকের ছাত্র, লালবাগে পড়ি, যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা বড় ছাত্ররা হাফেজ্জী হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের ভুমিকা কী হতে পারে এই যুদ্ধে? হুজুর বললেন- অবশ্যই জালেমদের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। আমি হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম-আমি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারবো? হুজুর বললেন –‘অবশ্যই যেতে পার’। অত:পর আমি গেরিলা প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়ে যাই এবং যুদ্ধে অংশ নেই।

প্রধান বক্তা মুহাম্মাদ আব্দুল জলিল আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছিলেন আলেম সমাজের একটি বড় অংশ। প্রমান করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন বাংলাদেশীদের একান্ত প্রয়োজন। আলেমদের ত্যাগ-তিতীক্ষা স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগিতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। এমনই অজানা আরও অনেক আলেম ওলামা রয়েছেন যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক আলেম সম্মুখ সমরে অগ্রগামী হয়ে আহত হয়েছেন, অনেকে শাহাদত বরণ করেছেন এমন আলেমের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা সভাপতি শিব্বির আহমাদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলব অথচ ওলামায়ে কেরামের কথা বলব না, তা হয় না। অবশ্যই স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবদানের বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষিত হতে হবে। তা না হলে ইতিহাসটি এক মহান দায় চিরদিন আমাদের কাঁধে থেকে যাবে। এখন ও বহু মুক্তিযোদ্ধা বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখা সে সময়ে পূর্ণবয়স্ক ও বুদ্ধি সম্পন্ন বহু নাগরিক, কোরো ধরণের ব্যাখ্যা ছাড়া তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করেন। তাঁদেরকে স্মরণ করা সকলের দায়িত্ব বলে মনে করি।

জেলা সভাপতি শিব্বির আহমাদ আরো বলেন, পূর্বের বহু আন্দোলনে আলেম সমাজের মূখ্য ভূমিকা ছিলো। বর্তমানেও দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় আলেমদেরকেই মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। সামাজিক বিভিন্ন কাজে আলেমদেরকে অংশগ্রহণ করতে হবে।
জেলা সভাপতি নবীন আলেম সংবর্ধনায় আগত সকল নবীন আলেমদের শুভেচ্ছা জানিয়ে যার যার অবস্থান থেকে ইসলামের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান এবং নারায়ণগঞ্জ এর তল্লায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে সদ্য গঠিত দূর্ঘটনায় নিহত ভাইদের মাগফেরাত ও আহত ভাইদের সুস্থতা কামনা করেন।

নবীন আলেম সংবর্ধনায় আরো উপস্থিত ছিলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারায়ণগঞ্জ জেলার সংগ্রামী সভাপতি মাওলানা আনোয়ার হোসেন জিহাদী, দ্বীনী সংগঠন নারায়ণগঞ্জ জেলার সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক মুফতি মাসুম বিল্লাহ, জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সভাপতি মাওলানা আনোয়ার হোসেন আদ দিফায়ী, ইসলামী যুব আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি মাওলানা শফিকুল ইসলাম, ইশা ছাত্র আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ হাসান, সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ সারোয়ার হোসেন, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুহাম্মাদ আনোয়ার হোসেনসহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে