আওয়ার টাইমস নিউজ।
ইসলামি জীবন ডেস্ক: বিশাল এই পৃথিবীতে আমরা প্রতিদিন কত শত ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে সময় পার করি। মাথার ওপরে অনন্ত আকাশ, পায়ের নিচে স্থির পৃথিবী, আর চারপাশের সুনিপুণ প্রকৃতি-সবকিছু যেন এক অদৃশ্য নিয়মে অবিরত চলছে।
কিন্তু আমরা আমাদের মহান রব আল্লাহর এই মহা সৃষ্টিজগতের গভীর রহস্য নিয়ে কতটুকু ভাবি? পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বারবার মানুষকে চিন্তা করার, গবেষণা করার তাগিদ দিয়েছেন। কারণ, আল্লাহর সৃষ্টির গভীরতা নিয়ে যিনি যত বেশি ভাববেন, তাঁর অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্ব ও ভালোবাসা তত তীব্রভাবে ধরা দেবে।
সৃষ্টির সেই অসীম মহিমা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সেদিন এক গভীর রাতে এক অদ্ভুত অনুভূতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। চারপাশ যখন নিঝুম, কোলাহলমুক্ত, তখন মহান আল্লাহর তৈরি এই মহাবিশ্বের শেষ সীমানা নিয়ে কোরআন, হাদিস ও আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু গবেষণা এবং কিতাব পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। পড়তে পড়তে সৃষ্টির এমন এক পরম ও অকাট্য সত্য চোখের সামনে উন্মোচিত হলো, যা দেখার পর হৃদয়ের ভেতরটা এক অজানা ভয়ে আর পরম ভক্তিতে কেঁপে উঠেছিল। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল। মনে হয়েছিল, এই বিশালতার সামনে আমি কতটা ক্ষুদ্র, কতটা নগণ্য!
তখনই অন্তরে এক তীব্র ব্যাকুলতা অনুভব করলাম-আজ দুনিয়ার মোহ আর ব্যস্ততায় আমরা যারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছি, স্রষ্টার মহত্ত্ব ভুলে নিজেদের বড় মনে করছি, তাদের সবার কাছে এই সত্যটি পৌঁছে দেওয়া কতটা প্রয়োজন। যদি কোনো একটি পথহারা হৃদয়ও এই মহাজাগতিক সত্য জেনে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবেই এই অশ্রু আর অনুভূতি সার্থক হবে। সেই পরম কল্যাণকামিতা আর আবেগ থেকেই আজকের এই লেখাটি আপনাদের সামনে তুলে ধরা...
আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে...
আজকের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astrophysics) তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও প্রযুক্তি দিয়ে মহাবিশ্বকে পরিমাপ করতে গিয়ে এক জায়গায় এসে পুরোপুরি থমকে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন "Cosmic Horizon" বা মহাজাগতিক দিগন্ত। বিজ্ঞান স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করছে যে-এটিই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের শেষ সীমানা, যার ওপারে কী আছে তা দেখার বা জানার ক্ষমতা মানুষের নেই। সেখানে কেবলই এক অসীম, রহস্যময় অন্ধকার শূন্যতা!
বিজ্ঞান যেখানে আজ এসে হাতকড়া পরে দাঁড়িয়ে গেছে, আমার আর আপনার প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ঠিক সেই শেষ সীমানার নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে গেছেন।
আমাদের চোখ যা দেখে, তা কেবল প্রথম আসমান!
কোরআন ও হাদিসের পাতা যখন উল্টানো হয়, তখন গা শিউরে ওঠে এই ভেবে যে-বিজ্ঞান আজ কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের যে গ্যালাক্সি আর নক্ষত্রপুঞ্জ আবিষ্কার করে বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলছে, তা আসলে মহান আল্লাহর তৈরি সাত আসমানের মধ্যে কেবল প্রথম আসমান মাত্র! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْইَا بِمَصَابِيحَ
অর্থ: "আমি সর্বনিম্ন আকাশকে (প্রথম আসমানকে) প্রদীপমালা (নক্ষত্ররাজি) দ্বারা সুশোভিত করেছি।" - (সূরা আল-মুলক: ৫)
তাফসীরে ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যায় এসেছে—আমরা চোখ দিয়ে বা টেলিস্কোপ দিয়ে যতদূর নক্ষত্র, ছায়াপথ বা আলোর কণা দেখতে পাই, এই পুরো দৃশ্যমান মহাশূন্যটাই হলো কেবল প্রথম আসমান। তাহলে একবার ভাবুন, প্রথম আসমানই যদি মানুষের কল্পনার বাইরে এত বিশাল হয়, তবে এর ওপরের দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা সপ্তম আসমান কত বড়?
সিদরাতুল মুনতাহা: সৃষ্টির শেষ সীমানা
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মেরাজের রাতে জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বজগতে ভ্রমণ করছিলেন, তখন সপ্তম আসমানের ওপর এক নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) নিজে থমকে দাঁড়িয়ে যান। তিনি আল্লাহর রাসূলকে বলেছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এর বাইরে যাওয়ার অনুমতি আমার নেই। আমি যদি এক চুল পরিমাণও সামনে যাই, তবে আল্লাহর নূরের তীব্রতায় আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাব।"
সেই পরম সীমানাকে আল্লাহ কুরআনে নাম দিয়েছেন "সিদরাতুল মুনতাহা"। যার অর্থ—প্রান্তসীমার বৃক্ষ।
عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ • عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ
অর্থ: "প্রান্তসীমার সিদরা বৃক্ষের নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত।" — (সূরা আন-নাজম: ১৪-১৫)
তাফসীরে জালালাইন ও মাআরিফুল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মুনতাহা’ শব্দের অর্থ শেষ সীমা। দুনিয়ার সৃষ্টিজগৎ থেকে শুরু করে ফেরেশতাদের জ্ঞান, সবকিছুই এই সীমানায় গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। বিজ্ঞান আজ যাকে "Cosmic Horizon" বলে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছে, আমার রব ১৪০০ বছর আগে তাকেই চিহ্নিত করেছেন সৃষ্টির শেষ সীমানা হিসেবে।
আল্লাহর আরশের বিশালতা এবং আমাদের ক্ষুদ্রতা
একটি হাদিস পড়ার সময় আমার চোখ দিয়ে পানি আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সাত আসমান ও সাত পৃথিবী মহান আল্লাহর কুরসীর তুলনায় মরুভূমিতে ফেলে দেওয়া একটি আংটির মতো। আর আল্লাহর কুরসীটি তাঁর আরশের তুলনায় মরুভূমিতে ফেলে দেওয়া একটি আংটির সমান।" -(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং-৩৬৪)
একটু মন থেকে গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবুন তো! যে বিশাল মহাবিশ্বের শেষ সীমানা খুঁজে না পেয়ে বিজ্ঞান আজ দিশেহারা, সেই পুরো মহাবিশ্বটা আল্লাহর আরশের সামনে মরুভূমির এক টুকরো সামান্য বালুকণার মতো পড়ে আছে!
হৃদয়ের গভীর থেকে কিছু আকুতি...
এই সত্যগুলো যখনই মনের ভেতর আলোড়ন তোলে, তখন পুরো শরীর অপার্থিব এক অনুভূতিতে কেঁপে ওঠে। যে অসীম, কল্পনাতীত মহাবিশ্বের মালিক মহান আল্লাহ, তাঁর সামনে আমরা কতটা তুচ্ছ।
অথচ, সেই আরশের মালিক, সেই রাজাধিরাজ আল্লাহ কত দয়ালু! তিনি এত বিশাল মহাবিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করার মাঝেও কিন্তু আমার বা আপনার মতো এক ক্ষুদ্র বান্দাকে ভুলে যাননি। গভীর রাতে যখন আপনি বা আমি একা ঘরে ফুঁপিয়ে কাঁদি, যখন বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস কেউ শোনে না, তখন কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের আরশের ওপর থেকে আমাদের মহান রব প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তিনি বান্দার অতি সন্নিকটে চলে এসে ডাকতে থাকেন-"কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? কে আছো রিজিক চাইবে, আমি তাকে রিজিক দেব?" (সহীহ বুখারী)।
আমরা কতই না উদাসীন! যে রবের সৃষ্টি এত বিশাল, এত ভয়ংকর সুন্দর, যার হাতের মুঠোয় আমাদের প্রতিটা নিঃশ্বাস, আমরা কীভাবে সেই রবের হুকুম অমান্য করে বুক ফুলিয়ে পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াই? কীভাবে আমরা নামাজ ত্যাগ করি?
আসুন আমরা আজ থেকেই আমাদের সমস্ত অহংকার, সমস্ত গুনাহের বোঝা নিয়ে সেই পরম সত্তার সামনে নত হই। যার আরশের সামনে এই মহাবিশ্ব কিছুই না, তাঁর চরণে এখনই সেজদায় লুটিয়ে পড়ে চোখের জল ছেড়ে দিয়ে বলি-" হে, আমাদের ইহকাল পরকালের একমাত্র মালিক আল্লাহ্ ! আমি আপনার এক অতি ক্ষুদ্র ও অপরাধী বান্দা। আপনি ছাড়া আমার আর কোনো আশ্রয় নেই। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।"
[সম্মানিত প্রিয় পাঠকদের প্রতি অনুরোধ:] আপনার মনের ভেতর যদি এই লেখাটি সামান্যতম আলোড়ন তৈরি করে থাকে, তবে নিজের ঈমানকে তাজা করতে এবং অন্য ভাইদের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় জাগিয়ে তুলতে লেখাটি শেয়ার করুন। আপনার একটি শেয়ার হয়তো কোনো পথহারা মানুষকে সিজদার পথ দেখাতে পারে। মন্তব্য ঘরে আপনার মূল্যবান অনুভূতি অবশ্যই জানাবেন। মহান আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য নিয়ে নিয়মিত লিখালিখি এবং গবেষণা করতে আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসেবে কবুল করুন আমীন।
কুরআন হাদীস ও আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে নিয়মিত আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জানতে আমাদেরকে আওয়ার টাইমস নিউজ এর ফেসবুক পেইজে লাইক কমেন্ট এবং ফলো সাথে থাকবেন। ধন্যবাদ