ইহুদিবাদী ইসরাইল কর্তৃক বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট: সাইফুল ইসলাম।
আওয়ার টাইমস্ নিউজ: গাজায় গতকাল রবিবার ইসরাইলি হামলায় ১৩টি শিশুসহ ৩৩ জন ফিলিস্তিনী শহীদ ও ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন – যা এবারের আগ্রাসনে একদিনে সর্বোচ্চ শহীদ হওয়ার রেকর্ড। টানা সাতদিনের ইসরাইলি আক্রমণে এ পর্যন্ত ৫৫টি শিশু ও ৩৩জন নারীসহ ১৮৮ জন ফিলিস্তিনী শহীদ এবং এক হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। অপরদিকে, হামাসের পাল্টা হামলায় এ পর্যন্ত ২টি শিশুসহ ১০ জন ইসরাইলি নিহত হয়েছে। ইসরাইলি হামলায় গাজায় হতাহতের জন্যে ১০টি অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছে মিসর।

গতকাল রবিবার দখলদার ইসরাইলি বাহিনী হামাসের শীর্ষ স্থানীয় নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ও তার ভাইয়ের বাড়ী ধ্বংসের দাবি করেছে। এ বোমা হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে তাদের সামরিক বাহিনী। তবে এতে কোনো হতাহতে খবর পাওয়া যায়নি। ইয়াহিয়া সিনওয়ার হলেন হামাসের গাজা অঞ্চলের রাজনৈতিক শাখার প্রধান। এছাড়া, তাঁর ভাই মুহাম্মাদও হামাসের একজন প্রভাবশালী সদস্য। গাজার খান ইউনিসে তাদের বাড়ী।

এদিকে (শনিবার) আরবি ভাষার স্কাই নিউজ চ্যানেল গাজার হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইসরাইল হামলায় বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করছে। ইতোমধ্যে এ গ্যাসে অনেক ফিলিস্তিনীর মৃত্যু হয়েছে! গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কাদারা বলেছেন: ইসরাইলি হামলায় শহীদ কয়েকজনের লাশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গাজায় হামলায় এ গ্যাস ব্যবহারে শহীদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইসরাইল গাজায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ঢুকতে দিচ্ছে না!

ওদিকে গেল শনিবার ইসরাইলি বাহিনী এক ঘণ্টার নোটিশে গাজায় মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও আল-জাজিরার কার্যালয়কে গুঁড়িয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি সম্প্রচারে আল-জাজিরার জেরুজালেম ব্যুরোর প্রধান ওয়ালিদ আল-ওমারি বলেছেন: এটা স্পষ্ট – যারা যুদ্ধ করছে, তারা গাজায় শুধু ধ্বংস আর মৃত্যুই বাড়িয়ে চলছে না, বরং তারা গণমাধ্যমগুলোকেও চুপ করিয়ে দিতে চায়। যারা এগুলো প্রত্যক্ষ করছে, তথ্য সংগ্রহ করছে ও সত্যের প্রতিবেদন করছে – তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে চায়। কিন্তু এটি অসম্ভব। আমরা চুপ থাকবো না। ইসরাইলি সেনারা গাজা উপত্যকায় যেসব অপরাধ নিয়মিত করে চলছে, এটি তারই অংশ।

ধ্বংস হওয়া ১১ তলার আল-জালা টাওয়ারে কর্মরত আল-জাজিরার সাংবাদিক সাফাওয়াত আল-খালুত বলেন: দু সেকেন্ডের ভেতরেই ভবনটি মাটির সাথে মিশে যায়! আমি ১১ বছর ধরে সেখানে কাজ করছি। আমি অনেক ঘটনা ভবনটি থেকে কাভার করেছি, আমরা ব্যক্তিগতভাবে পেশাদার জীবন যাপন করেছি, দু সেকেন্ডের ভেতরে এখন সবকিছুই হারিয়ে গেলো! এ ভবন থেকে আমি অনেক ঘটনার খবর প্রচার করেছি। এখানে সহকর্মীদের সাথে আমাদের অনেক সুখস্মৃতি রয়েছে।

আল-টাওয়ারটি গুঁড়িয়ে দেয়া হলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। টাওয়ারের মালিক জাওয়াদ মেহদি বলেন: একজন ইসরাইলি গোয়েন্দা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ভবনটি খালি করতে তার মাত্র এক ঘণ্টা সময় রয়েছে। ফলে, ১ ঘণ্টার ভেতরেই সংবাদ কর্মী ও টাওয়ারের বাসিন্দারা টাওয়ার ত্যাগ করেন।

এদিকে, গতকাল রবিবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছে: আমরা কোনো অপরাধ করিনি। যারা আমাদের আক্রমণ করে চলেছে, সব দায় তাদেরই নিতে হবে। যতোক্ষণ দরকার – ততোক্ষণ গাজায় হামলা চলবে। হামাসের মতো ইচ্ছে করে সাধারণ নাগরিকদের নিশানা করছি না আমরা, বরং নিরীহ নাগরিকদের এড়িয়ে সন্ত্রাসীদের ওপরই আঘাত হানছি।

জবাবে হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়া বলেছেন: প্রতিরোধ থেকে পিছু হটবে না ফিলিস্তিনীরা। মসজিদুল আকসার ওপর আঘাত কখনোই বরদাশত করা হবে না। ইসরাইলিরা ভেবেছিলো – তারা আল–আকসা মসজিদ ধ্বংস করে দিতে পারবে। ভেবেছিলো – তারা আমাদের জনগণকে গৃহহীন করতে পারবে। আমি নেতানিয়াহুকে বলছি— আগুন নিয়ে খেলবেন না।

ওদিকে, হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে বলেছেন: আমি ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়ে যাবো। হামাস ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর রকেট হামলা ঠেকাতে নিজেকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে ইসরাইলের।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের উদারপন্থীরা বাইডেমের এ কথার ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। নিউইয়র্কের কংগ্রেসম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-করটেজ বৃহস্পতিবার বলেন: তাহলে কি ফিলিস্তিনীদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই? তিনি এক টুইটে বলেন: বাইডেন প্রশাসন একটি মিত্রের বিপক্ষে সাহস নিয়ে দাঁড়াতে না পারলে, আর কে পারবে? তাহলে কীভাবে দাবি করবেন যে আপনারা মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন?

মিশিগানের কংগ্রেসম্যান রশিদা তালিব বলেছেন: ইসরাইল গণমাধ্যমকে টার্গেট করছে। কিন্তু বিশ্ব তাদের যুদ্ধাপরাধ দেখতে পারছে না।

শুক্রবার নিউইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে ডেমোক্র্যাট নেতা সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স লিখেছেন: যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অনতিবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানানো। তারা নেতানিয়াহু সরকারের সমর্থক হতে পারে না।

মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য কোরি বুশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করতে প্রয়োজনীয় সমর্থন দিতে দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এক টুইটে বলেছেন: ‘কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন রক্ষার আন্দোলন আর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার আন্দোলন একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত।’ আফ্রো-আমেরিকান এ নারী মিসৌরির ফার্স্ট কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

এদিকে, (রোববার) ফিলিস্তিনের ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট রূহানীর সাথে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ফোনালাপ করেছেন। এতে উভয় শাসক একমত হন যে, ফি‌লি‌স্তিন মুস‌লিম উম্মাহর সব‌চে‌য়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর জায়নিস্ট রে‌জিমকে সব অপরাধ থে‌কে টে‌নে ধর‌তে আন্তর্জা‌তিক সকল সু‌যোগ কাজে লাগাতে হবে।

এরদোয়ান বলেন: ইসরাইল ফিলিস্তিনীদের সাথে যা করছে – এর বিরুদ্ধে তুরস্ক কঠোর ব্যবস্থা নেবে। ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে অবশ্যই মুসলিম জাহানকে অভিন্ন আলোচনা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর উচিত – এখনই ইসরাইলকে কঠিন বার্তা দেয়া।

ওদিকে, অধিকৃত গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অব্যাহত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বিমান হামলায় শরণার্থীশিবির, মিডিয়া হাউস ও সাধারণ বাড়ীঘর – কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। এ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। নিউইয়র্ক থেকে মাদ্রিদ এবং কেপটাউন থেকে বাগদাদ পর্যন্ত এসব প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে হামলা বন্ধের দাবি ও ফিলিস্তিনীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। তারা ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’ নামাঙ্কিত পতাকা নিয়ে ‘ইন্তিফাদা বা গণজাগরণ জিন্দাবাদ’ বলে এ সময় শ্লোগান দেন। বেশিরভাগ মানুষকে এ সময় ‘ফিলিস্তিনের সঙ্গে সংহতি’ ছাড়াও নানা প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায়। তবে কোনো কোনো শহরে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার ফিলিস্তিনিদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেয়ায় অস্ট্রিয়ার ক্ষমতাসীন দল ওভিপির (অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টি) সাংসদ রেসুল ইয়েগিটকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে! দলের জন্যে বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান কুর্জের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে পরিচিত এ জনপ্রিতিনিধি সেদিন ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লিখে ফিলিস্তিনের পতাকা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল পিকচারে রাখেন। এর দেড় ঘণ্টা পরই দলের প্রধান কার্যালয় থেকে ফোন করে তার বহিষ্কারাদেশের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়। কট্টর ডানপন্থী বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

ইয়েগিট বলেন: কোনো প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি কার্যালয়ে অন্য দেশের পতাকা টাঙিয়ে রাখতে পারলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি আমার পছন্দের দেশকে সমর্থন করতে পারবো না কেন?

২০১৫-১৯ পর্যন্ত দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তরুণ এ রাজনীতিবিদ। এরপর বাকি দু বছর কেন্দ্রীয় প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তিনি। ইউরোপীয়রা মুখে যতোই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলুক না কেন – আসলে ওরা যে, ধর্মান্ধ খৃষ্টান রেসুলকে বহিস্কার করে, তা আবারো প্রমাণ করলো।

সেদিন (শুক্রবার) কোপেনহেগেনে ইসরাইলি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন চার হাজার মানুষ। এক পর্যায়ে দূতাবাসের দিকে পাথর ছুঁড়তে থাকে বিক্ষোভকারীদের একাংশ। তখন ডেনিশ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশের ওপরও পাথর ছুঁড়েন তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়ে ও লাঠিপেটা করে এবং সেখান থেকে তিন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে।

বাদ জুমা টোকিও’র শিবুইয়া এলাকায় একটি মসজিদ থেকে মজলুম ফিলিস্তিনীদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং ইসরাইলের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বের হওয়া বিক্ষোভ মিছিলে বিক্ষুব্ধ জাপানিরা অংশ নেন। তাদের হাতে ‘ফ্রিডম ফর গাজা’ এবং ‘প্রোটেক্ট প্যালেস্টাইন’ লেখা প্ল্যাকার্ড ছিলো। এতে অংশ নেয়া ফিলিস্তিনের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বলেন: ‘আজ আমি আপনাদের সামনে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি জানি না – ইসরাইলের বর্বরোচিত হামলায় আমার বাবা-মা, ভাই-বোন বেঁচে আছেন – কী-না। আপনারা না জেনেই কেন একটি সন্ত্রাসী ও অবৈধ রাষ্ট্রকে সমর্থন দিচ্ছেন? আপনাদের আশকারা পেয়ে বর্ণবাদী দখলদার এ রাষ্ট্রটি এখন নির্বিচারে নারী ও শিশুসহ নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনকে বোমা মেরে হত্যা করছে। দয়া করে ইসরাইলকে সমর্থন দেয়া বন্ধ করুন।’ তার আবেগঘন বক্ততায় সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে!

গেল (শনিবার) রাতে দোহায় কাতারের জাতীয় মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিক্ষোভকারীদের কাতার, ফিলিস্তিনী ও নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে সংহতি জানাতে দেখা গেছে। তারা শ্লোগানে শ্লোগানে ইসরাইলি বাহিনীর অবৈধ ও অমানবিক আচরণ এবং হামলার নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনীদের প্রতি ভালোবাসা ও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। এমনকি তারা আল-আকসা মসজিদের জন্যে জীবন কুরবান করতে প্রস্তুত আছেন বলে ঘোষণাও দেন। তারা গাজায় ইসরাইলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ হিসাবে আখ্যা দেন।

সেদিন একই ইস্যুতে জার্মানীজুড়েও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। বার্লিনসহ ফ্রাঙ্কফুর্ট, লাইপজিগ, স্টুটগ্রার্ট, মিউনিখ, হামবুর্গ, কোলন, হ্যানোভার ও হিল্ডেসহাইম শহরে কয়েক হাজার মানুষ এ প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন।

সেদিন লন্ডনেও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেছেন কয়েক লাখ মানুষ। এতে বিপুল প্রবাসী বাংলাদেশীও অংশ নেন। সকাল ১১টা থেকেই সেন্ট্রাল লন্ডনের মার্বেল আর্চ এলাকায় জড়ো হতে থাকেন ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। প্রতিবাদের শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। ‘ইসরাইল বের হও’ এবং ‘ফিলিস্তিনের জন্যে স্বাধীনতা’সহ নানা শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভকারীরা হাইড পার্ক হয়ে লন্ডনের ইসরাইলি দূতাবাসের সামনে এসে সমাবেশ করে।

সেদিন প্যারিসেও ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়। তবে সংঘর্ষের আশঙ্কায় বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আদালতও বিক্ষোভের বিরুদ্ধে একটি নির্দেশ জারি করেন। বিক্ষোভ আয়োজনকারীরা বলেন: ‘ফিলিস্তিনীদের প্রতি সমর্থন জানাতে আমাদের নীরব করে দেয়াকে প্রত্যাখ্যান করি। বিক্ষোভ প্রদর্শন করা থেকে আমাদের ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।’ পরে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হয়েছেন কয়েকজন। এছাড়াও ফ্রান্সের লিওঁ, বোর্দো, মার্সেইসহ অন্যান্য শহরে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভ করেছেন মানুষ। ইউরোপে সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বাস দেশটিতে। এছাড়া, ইসরাইল ও আমেরিকার বাইরে সবচেয়ে ইহুদিরও বাস ফ্রান্সে।

সেদিন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও মেলবোর্নে বিক্ষোভ হয়েছে। সিডনিতে টাউন হলের সড়কগুলোতে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। ফিলিস্তিনের পক্ষে শ্লোগান দেয় তারা। মেলবোর্নে ভিক্টোরিয়া স্টেট লাইব্রেরির সামনে জড়ো হন কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী। মিছিল নিয়ে তারা সংসদ ভবন পর্যন্ত যান। তাদের অনেকে ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

আমেকিরকার নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, আটলান্টা এবং অন্য কয়েকটি শহরে ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনীদের পক্ষে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।

একই ইস্যুতে প্রতিবাদ জানানোয় কাশ্মীরে গ্রাফিতি শিল্পী মুদাসসির গুলসহ (৩২) ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশ। শ্রীনগরের মুদাসসির গুলের আঁকা গ্রাফিতি ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলেছে ভারত সরকার। তিনি সেখানে লিখেছিলেন – ‘উই আর প্যালেস্টাইন’। গ্রেপ্তারদের মাঝে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও রয়েছেন – যারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে দোয়া করেছিলেন।

ভারতীয় পুলিশ বলেছে, ফিলিস্তিনের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে কাশ্মীরে শান্তি-শৃঙ্খলা যারা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে, তাদের গভীর নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ। জনগণের মর্মবেদনা বিষয়ে পুলিশ সংবেদনশীল। তবে অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ দেয়া হবে না। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় নানান ধরনের পোস্ট করেছে, ইসরাইল বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে এবং গ্রাফিতি একেছে।

উল্লেখ্য, দখলদার ও বর্ণবাদী ইসরাইলের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং ভারতের অন্যতম অস্ত্র সরবরাহি ইসরাইল। আর সেসব অস্ত্র কাশ্মীরে বিক্ষোভ দমনেও ব্যবহার করে থাকে ভারতীয় পুলিশ।

এদিকে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে জীবন ও জীবিকা দু-ই হারানোর আতঙ্কে আছে ভারতীয় নার্সরা। ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, ইসরাইলে অন্তত ১৪ হাজার প্রবাসী ভারতীয় রয়েছে। এদের মাঝে ১৩ হাজারেরও বেশি আছে নার্স। ইসরাইলের বিমান হামলার জবাব দিতে হামাস দু হাজারেরও বেশি রকেট হামলা চালিয়েছে ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে। এর প্রায় ১০-২০% ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানায় এক ভারতীয় নারীও নিহত হয়েছে। ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনের সাথে ইসরাইলের সংঘাতে হামাসের প্রায় সব রকেটই আটকে দেয় ইসরাইলের আয়রন ডোম। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। হামাসের ছোঁড়া অনেক রকেটই আটকাতে পারছে না আয়রন ডোম। ফলে, ইসরাইলিদের পাশাপাশি সেখানকার প্রবাসী ভারতীয়রাও চরম আতস্কে রয়েছে।

গতকাল (রোববার) ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি নিয়ে ওআইসির সদস্যদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু এক টুইটে বলেছেন: ফিলিস্তিনের জন্যে আমাদের ঐক্য ও দৃঢ়তা দেখানোর সময় এসেছে। উম্মাহ আমাদের নেতৃত্বের জন্যে অপেক্ষা করছে। প্রয়োজনীয় যে কোনো পদক্ষেপ নিতে তুরস্ক প্রস্তুত রয়েছে। ওআইসির নির্বাহী কমিটির জরুরি বৈঠকে ফিলিস্তিনে চলমান নৃশংসতার জন্যে এককভাবে ইসরাইলকে দায়ী করা হয়েছে।

ওআইসির বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ‘নগ্নভাবে লঙ্ঘন’ করায় ইসরাইলের নিন্দা জানিয়েছে সউদী আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আস-সৌদ। তিনি সামরিক হামলা বন্ধের জন্যে জরুরি পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে, ইতালির অনলাইন পত্রিকা কন্ট্রোপিয়ানো জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সেনারা বর্বর আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রেক্ষাপটে ইসরাইলের কাছে অস্ত্রের চালান সরবরাহে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরিকল্পনা নিয়েছে ইতালির বন্দর শ্রমিকরা। অস্ত্রের একটি চালান ইসরাইলে যাচ্ছে – খবর পেয়ে ইতালির লিভোরনো শহরের বন্দর শ্রমিকরা তাতে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অস্ত্র ভর্তি কয়েকটি কন্টেইনার জাহাজে তুলে দিতে বন্দর শ্রমিকদের টিপস দেয়ার পর, শ্রমিকরা জানতে পারে যে, এসব কন্টেইনার ইসরাইলের বন্দরনগরী আশদোদে যাবে। এসব কন্টেইনারে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিলো। সূত্র: আল-জাজিরা, টিআরটি, আনাদোলু, পার্সটুডে, স্কাই নিউজ চ্যানেল, এএফপি, ফ্রান্স২৪ ও কন্ট্রোপিয়ানো।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে