পাশ্চাত্য বিষয়ক এরদোয়ানের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি।

0

Our Times News

গত ২/৩ সপ্তাহে কতো কী না ঘটে গেলো! আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাইডেনের বিজয়, নাগোর্নো কারাবাখ যুদ্ধে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজারবাইজানের জয়, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সারা মুসলিম জাহানে জনরোষ, করোনাভাইরাসের নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদি।

এসব কিছুই সারা বিশ্বের রাজনীতিতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সবগুলো দেশই নতুন করে ছক আঁকতে শুরু করেছে।

ট্রাম্পের আমলে যে স্টাইলে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবেলা করা হতো – বাইডেনের সময় সে নিয়ম চলবে না। এর আগের লেখাও আমি বলেছিলাম – বাইডেনের বিজয় এ অঞ্চলের রাজনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্কে নতুন মোড় নিয়ে আসবে।

তুরস্কের কথাই ধরি। দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের গত দু সপ্তাহের বক্তব্য এবং দেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আভাস, বিচার বিভাগে সংস্কারের পরিকল্পনা – এসবই আঙ্কারার নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিরই অংশ বিশেষ।

ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে তুরস্কের গত প্রায় পাঁচ বছরের ভঙ্গুর সম্পর্ককে নতুন করে জোড়া লাগাতে এরদোয়ান পশ্চিমাদের সঙ্গে সমঝোতার আভাস দিয়েছেন।

এরদোয়ানের পশ্চিমা নীতির পেছনে কী আছে?

তুরস্কের অর্থনীতি ক-বছর ধরেই খুব খারাপ যাচ্ছিলো। ২০০৩ সাল থেকে যে এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্ক তার অর্থনীতিতে চমক দেখিয়ে বিশ্বের ১৫শ স্থানে চলে এসেছিলো। তুর্কিরা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলো। সেই এরদোয়ানের নেতৃত্বেই আবার অর্থনীতির ধস নেমে এসেছে! প্রায় ২০ বছর ধরে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে একটানা ক্ষমতায় থাকার পিছেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সার্বিক জীবনমানের উন্নতি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছিলো।

এখন ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মূল্য-হ্রাস, বাজার মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের হার – এসব কিছু ক্ষমতাসীন এরদোয়ানকে ভাবিয়ে তুলেছে।

অর্থনৈতিক সমস্যার অনেকগুলো কারণ থাকলেও মূল কারণটি ছিলো পশ্চিমাদের সঙ্গে তাঁর সাপে-নেউলে সম্পর্ক। সুদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সুদ চক্র তার অর্থনীতির গলা এমনভাবে চেপে ধরেছিলো যে, শেষ পর্যন্ত তাকেই হার মানতে হলো! আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার আর বিনিয়োগকারীদের সবগুলো দাবি তিনি মেনে নিলেন; যেমন- তাঁর জামাতাকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর থেকে তাঁর নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে ব্যাংকটিকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিলেন যেনো ব্যাংকটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অঙ্গনের চাহিদা মতো সুদের হার বাড়াতে পারে!

২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যূথানের পরে দেশের ভেতরে আইনের শাসন নিয়ে অনেক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিলো। সুতরাং আইন ও বিচার বিভাগে সংস্কারের দাবি ছিলো অনেক দিনের। সেটাও তিনি মেনে নিলেন!

অনেক দিন ধরে ইউরোপের সঙ্গে চলছিলো অবিশ্বাস। তুরস্ক যেমন ইউরোপের কোনো প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করতে পারেনি – ইউরোপও তেমনি বিভিন্ন দিক দিয়ে তুরস্ককে ঘায়েলের চেষ্টা করেছে। ফলে, তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে এসেছে।

পরে মুসলিম জাহানকে নিয়ে নতুন এক বলয় তৈরির চেষ্টা করছিলো তুরস্ক। কিন্তু সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সউদী যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমান, আবুধাবীর ক্রাউন প্রিন্স শেখ মুহম্মদ বিন জায়েদ আন-নাহিয়ান এবং মিশরের সামরিক-জান্তা আব্দেল ফাত্তাহ আস-সিসি। আর এ কারণে তুরস্ক আবার ফিরে যেতে চাচ্ছে পশ্চিমা বলয়ে।

গত সপ্তাহে এরদোয়ান তো সরাসরি ঘোষণাই দিলেন যে, তুর্কীরা নিজেদেরকে ইউরোপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করে। তুরস্কের ভবিষ্যত, তুরস্কের ভাগ্য ইউরোপের সঙ্গে একই সুতায় বাঁধা! তিনি ন্যাটোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এ সামরিক জোটে তাঁর দেশের অবদানও তুলে ধরেন। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করার ঘোষণা দেন। শুধু কিছু বক্তব্য দিয়েই শান্ত হননি তিনি। তিনি তাঁর মেসেজ আরো স্পষ্ট করে তুলে ধরতে তার প্রধান উপদেষ্টা ইব্রাহীম কালিনকে ইইউর হেড কোয়ার্টারে পাঠান। কালিন সেখানে ইইউর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে তুরস্কের আগ্রহের কথাগুলো তুলে ধরেন।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এরদোয়ানের ভাষণ আর কালিনের বৈঠকে কতোটা প্রভাবিত হয়েছে, তা বুঝতে আরো দু সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। কেননা, ডিসেম্বরের ১০-১১ তারিখ ইইউ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্কের বিরুদ্ধে কিছু অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা জারির কথা রয়েছে।

আমেরিকা থেকে এখনই তুরস্কবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম। কিন্তু ইইউ-তুরস্ক সম্পর্ক আগামী কয়েক দিনে নতুন মোড় নিতে পারে।

ইইউ-তুরস্ক সম্পর্কে তিনটি প্রধান সমস্যা:

১। তুরস্কের সঙ্গে ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াসহ ইইউ’র কিছু সদস্য দেশের মুসলমান ও তুর্কী বিরোধী কট্টর মনোভাবে উদ্ভূত দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।

২। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পানিসীমা ও খনিজ সম্পদ নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে গ্রীস ও গ্রীক সাইপ্রাসের সঙ্গে স্বার্থের দ্বন্দ্ব।

৩। তুরস্কে অবস্থানরত ৪০ লাখেরও বেশি সিরীয় শরণার্থী এবং তাদের নিয়ে ইইউর সঙ্গে আঙ্কারার চুক্তি।

তুরস্কের বিরুদ্ধে ইইউ’র অবরোধ নিষেধাজ্ঞা কতোটা ফলপ্রসূ হবে?

উপরোক্ত বিষয়গুলোর মাঝে যে বিষয়টি আঙ্কারার জন্যে সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, তা হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা।

ইইউ নেতৃবৃন্দ ১০-১১ ডিসেম্বরের শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবরোধ আনার কথা ভাবছে। এক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত তুরস্কের ওরুচ রেইস নামক জাহাজ এবং এর পাহারায় নিয়োজিত যুদ্ধ জাহাজগুলোকে ফেরত আনার দাবি জানিয়েছে ইউরোপ।

তুরস্ক ঐ সম্মেলনের আগে জাহাজগুলোকে ভূমধ্যসাগর থেকে ফেরত আনার ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু এ ইঙ্গিতে বিশ্বাস করতে পারছে না ইউরোপ। কেননা, অক্টোবরেও এ রকম একটি অবরোধের হুমকির মুখে ওরুচ রেইস জাহাজটিকে ক-দিন বন্দরের নোঙ্গর করে রেখেছিল আঙ্কারা। কিন্তু পরে আবার সাগরে পাঠায়। উত্তেজনা নতুন করে দানা বাঁধে।

এবার জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেলও বলেছেন যে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় ইস্যুতে বিষয়গুলো সঠিক দিকে অগ্রসর হচ্ছে না। সুতরাং তুরস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা নিয়ে ১০ই ডিসেম্বর আলোচনা হবে।

ফ্রান্স আর অস্ট্রিয়া তো অনেকদিন ধরেই তুরস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাবনা নিয়ে আসার চাপ দিচ্ছে ইইউকে।

তবে ইইউর অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা তুরস্কের বিরুদ্ধে কতোটুকু প্রভাব ফেলবে, তা এখই বলা কঠিন। তবে তুরস্কের বিরুদ্ধে ইরানের মতো সার্বিক অবরোধ আসার সম্ভাবনা নেই। কিছু কোম্পানি, ব্যক্তি, দু-একজন মন্ত্রী এবং হয়তো গ্যাস সন্ধানে নিয়োজিত তুর্কী জাহাজে কর্মরত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। এছাড়াও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কিছু বিধি-নিষেধ আসার আশংকা রয়েছে। ইইউ’র কিছু দেশ অবশ্য তুরস্কের বিরুদ্ধে সামরিক অস্ত্র বিক্রির নিষেধাজ্ঞা আরোপের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে তুরস্কের নিজস্ব অস্ত্র তৈরির খাত যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে এ ধরনের অবরোধের প্রভাব তেমন একটা পরবে না। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বড় কোনো অবরোধ আসলে তুরস্ক অনেক বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। কেননা, তুরস্ক ইইউ’র সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদারগুলোর একটি। তুরস্কের রপ্তানির প্রায় অর্ধেক যায় ইউরোপে।

তুরস্ক কী চাচ্ছে?

১। তুরস্ক চাচ্ছে ইইউ ও আমেরিকার যেনো আঙ্কারার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করে। গুরুত্বপূর্ণ এক ন্যাটো সদস্য হিসেবে যেনো সঠিক মূল্যায়ন এবং ইইউ’র সঙ্গে যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো আছে, সেগুলোর দ্রুত সমাধান।

ইইউ’র সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর শুরুতেই আসে আঙ্কারা-ব্রাসেলসের মাঝে শুল্ক ইউনিয়ন চুক্তির নবায়ন। ১৯৯৫ সালের এ চুক্তি নিয়ে তুরস্ক অনেকদিন ধরেই নবায়নের তাগিদ দিয়ে আসছে। কেননা, চুক্তির পরে ইইউতে অনেক দেশ যুক্ত হয়েছে এবং আমদানি রপ্তানিতেও অনেক পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে।

২। তুর্কিদের জন্যে ভিসামুক্ত ইউরোপ ভ্রমণ। তুরস্কের ইইউ’র সদস্যপদ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হলেও আঙ্কারা-ব্রাসেলসের মাঝে একটি চুক্তি হয়েছিলো ২০১৫ সালে। সেই চুক্তি মোতাবেক কিছু শর্তসাপেক্ষে তুর্কিদেরকে বিনা ভিসায় ইইউ ভ্রমণের সুযোগ দেয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

৩। শরণার্থী ফেরত চুক্তির নবায়ন। ২০১৫ সালের ঐ চুক্তি মোতাবেক, তুরস্ক গ্রীস থেকে সিরীয় শরণার্থী ফেরত নেবে এবং ইইউ এ শরণার্থীদের ভরণপোষণ বাবদ তুরস্ককে ৬ বিলিয়ন ইউরো দিবে। তুরস্ক তার প্রতিশ্রুতি পালন করলেও ইইউ চুক্তি মতো অর্থ পরিশোধ করেনি।

তবে আপাতদৃষ্টিতে গত ক-সপ্তাহে আঙ্কারায় সংস্কারের যে হাওয়া বইছে, তা তুরস্কের সঙ্গে আমেরিকা ও ইইউ’র সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দিলেও বর্তমান পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হবে বলে আমার মনে হয় না। তুরস্ক ইউরোপ বা আমেরিকার চাহিদা মতো তাদের আজ্ঞাবহ সেবক হিসবে কাজ করবে না। আর আমেরিকা-ইউরোপও তুরস্কের চাওয়াগুলো পূরণ করবে না।

মূল লেখক: সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার ও আঞ্চলিক প্রধান, আনাদোলু এজেন্সি।

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে