আওয়ার টাইমস নিউজ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক পালাবদল এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শক্ত অবস্থান নিয়ে বর্তমানে সর্বত্র চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে এই রাজনৈতিক উত্থানের নেপথ্যে থাকা সামাজিক বিভাজন, সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা এবং একজন সংখ্যালঘু মানুষের দৈনন্দিন লড়াইয়ের চিত্রটি কেমন?
তেমনই এক অম্লমধুর ও যন্ত্রণার আখ্যান তুলে ধরেছেন মীর রাকেশ রৌশান। শৈশবের বন্ধুত্ব থেকে শুরু করে কর্মজীবন, প্রেম এবং রাজনীতি, প্রতিটি ধাপে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে যে অদৃশ্য দেয়ালের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তারই এক নিদারুণ দলিল এই ‘খোলা চিঠি’। একজন সচেতন নাগরিক এবং সংবাদকর্মীর কলমে উঠে আসা সেই লেখাটি আমাদের আওয়ার টাইমস নিউজ পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
আমি মীর রাকেশ রৌশান। পিতার নামের শেষে ইসলাম আর মায়ের নামের শেষে বেগম আছে। ফলে মুসলমান। এদেশে, এরাজ্যে তৃণমূল থাকা বা বিজেপি আসা নিয়ে আমার তেমন কোন কিছুই যায় আসে না। পরিবর্তন বা প্রত্যাবর্তনে অবাক হইনা। কিছু কিছু জিনিস যখন ভাবায় তখন হয়তো পক্ষ নিই।চেষ্টা করি পক্ষ অবলম্বন করে মানুষের যাতে ভালো হয়। সমাজ যাতে ভালো থাকে। কাল সারাদিনই প্রায় ঘুমোচ্ছি। বিজেপি আসাতে বেশ কিছু বন্ধু বারবার ফোন করছে। আমাকে ঘুমের ঘোরে দেখে তারা অবাক। তাদের প্রথম প্রশ্ন ঘুম কি করে আসছে। আমি হতাশ নই কেন? সব্বাইকে এতো কিছুর উত্তর দেওয়া মুস্কিল ফলে ওপেন লিখে দিলাম সবার বুঝতে সুবিধা হবে।
স্কুল জীবনে যে বন্ধুকে মাঝে মধ্যে খেলার জন্য ডাকতে যেতাম। সে কোন দিন আমাকে বাড়ির ভেতরে ডাকেনি। আমি ডাকলে সেও আমাদের বাড়ি আসতো না। কোন ক্রমে আসলেও কিছু খেত না। সেই সময় ওই বিষয়গুলো বুঝতাম না। পরে বুঝতে পেরেছি আমি মুসলিম।
যে বন্ধুটি মাধ্যমিক ফেল করেছিলো তার পরীক্ষার আগে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার থেকে নোটস ম্যানেজ করে পরীক্ষার কয়েক মাস আগে যখন ওর বাড়ি নোটসগুলো দিতে যায় বন্ধুর মা আমার হাত থেকে নোটসটা না নিয়ে মেঝেতে রাখতে বলেছিলেন। পরে সেটাও বুঝেছিলাম আমি মুসলিম।
স্কুল শেষ করে কলেজ জীবনে বাম ছাত্র-রাজনীতি করতাম, ভেবেছিলাম বামপন্থী হবো। সমাজ বদল করবো। ভোটের জেতার পর ইউনিয়ন রুমে কিছু বন্ধু অজান্তে নাকি জেনে জানি না, কথায় কথায় ইয়ার্কি মেরে বলতো 'কাটা'কে সঙ্গেনে। পরে 'কাটা' মানে বুঝেছি। 'কাটা' মানে আমার পেনিসের ডগাটা চামড়াটা প্রতিটি মুসলমানের মতই কাটা।
বন্ধুদের বাড়ি ঘর যেতে আমি খুবই ভালোবাসি। কোন এক বন্ধুর বাড়িতে বুঝেছিলাম আমি বাংলা কথা বললেও সংখ্যাগরিষ্ঠরা বিশ্বাস করে আমি বাঙালি নই। এমন অনেক জায়গায় বলতে শুনেছি " বিশ্বাস করো তুমি একদমই মুসলমানদের মত নও।' বলতে শুনেছি " তুমি মুসলমান? আমি তো ভাবছিলাম বাঙালি।'
জীবনের প্রথম চাকরি জয়েনের সময় আমি যেহেতু মুর্শিদাবাদবাসি তাই ভোটার,প্যান, আঁধার থাকার সঙ্গে ফাস্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট এর থেকে একটা এফিডেফিট করে অফিসে জমা দিতে হয়েছিলো। বিশ্বাস করাতে হয়েছিল আমি বাংলাদেশি নই। পরে মানথলি মিটিংও আমাকে আমার রিজুনাল ম্যানেজার অপমান করতো। একবার তো সব্বার সামনে বলে ছিলো 'তুই মুর্শিদাবাদী, তারপরে মুসলমান, তোদের জাতটাই এমন তোদের কে কি বিশ্বাস করা যায়?'
আমার প্রেমিকা খুব উদার,ধর্মনিরপেক্ষ,মার্ক্সবাদী ছিল। অসাধারণ মানুষ। মাঝে মাঝে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতো 'মীর আমি তোমাকেই ভালোবাসি।' সেও একদিন বলেছিল ' মুসলমান ছেলেকে বাড়ি থেকে মেনে নেবে না বুঝলে, আমার কিচ্ছু করার নেই।'
NRC আন্দোলনের মিছিলে হাঁটছি। একসাথে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি করা খুব কাছের বন্ধু হাঁক দিচ্ছে 'মীর... মীর...' কাছে গিয়ে হাতের সিগারেটটা কাউন্টার দিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে বন্ধু বলেছিল " NRC নিয়ে তোদের লড়াই খুব শক্ত হয়ে গেলো, দেখ কতটা পারিস।'
প্রতিমাসে এক সম্পাদকের দশ কপি করে পত্রিকা বিক্রি করে দিতাম। প্রতি মাসের পত্রিকা নেওয়ার সময় আমার কবিতাটি বেরিয়েছি কি না পাতা উলটে দেখতাম। পরে বুঝতে পারি মীর রাকেশ রৌশান নামে হকার হতে পারে কবি নয়।
বামপন্থী রাজনীতি করার সময় শহরের অন্যান্য কমরেডরা জায়গায় কিনলেও শহরের নিদিষ্ট জায়গায় আমাকে জায়গা বিক্রি করতে চাইনি। কারণ আমার বাবার নামের শেষে ইসলাম আছে।
এই তো, এই SIR এর সময়য়ে আমি বুঝেছি বর্ণবাদী বাবু ভদ্র সমাজকে। যাদের সামনে বলা যাবে না নিদিষ্ট কমিউনিটি টার্গেট হয়েছে।
এমন অনেক ঘটনা অন্য মানুষের জীবনে উলটে প্রান্তেও ঘটছে। যদিও এইসব বিষয় নিয়ে লিখতে আর ভাল্লাগে না। অনেকে ভাবে কালচারাল পলিটিক্স করি। আমার মনে হয়েছে স্কুল, কলেজের ডিগ্রীর থেকে এই জাতির তাঁদের ইতিহাস,সংস্কৃতি জানাটা জরুরি। আর সবচেয়ে জরুরি বাড়ির প্র্যাকটিস। সমাজ পরিবর্তন হয় বাড়ি থেকেই।
ফলে গ্রামে বসে একটা ওয়েব পোর্টাল চালানোর চেষ্টা করেছি,গবেষণা করার চেষ্টা করি, পত্রিকা চালানোর চেষ্টা করি। বাড়িতে ছবি আঁকার ক্লাস শুরু করেছি। গানের ক্লাস করেছি। নাচের ক্লাস করেছি। আবৃত্তির ক্লাস করেছি। গ্রামের বাচ্চাদের একটা উদার প্র্যাকটিসে রাখার চেষ্টা করেছি। আমাদের বাড়িটা শনিবার-রবিবার বাচ্চাদের দখলে থাকে। বিভিন্ন গণ আন্দোলনে থাকার চেষ্টা করি। এই মাঝ বয়সে এসে আমি হিন্দুত্ববাদ, সংখ্যাগরিষ্ঠের দামামা, ব্রাহ্মণ্যবাদ কি কেন কেন কিসের জন্য, আমি জানি। আমি জানি ইসলামফোবিয়া কি।
দু বছর ধরে ফ্যাসিবাদ নিয়েই কাজ করছি, ফলে আমি ফ্যাসিবাদের ভয়াবহতা কি সেটা খুব ভালো ভাবে জানি। আমি জানি একজন গ্রামে থাকা মানুষ আর শহুরে প্রিভিজেলের মধ্যে পার্থক্য। আমি জানি একজন সংখ্যালঘু লেখক আর একজন সংখ্যাঘুরু লেখকের পার্থক্য। আমি জানি আমাদের গ্রামের কবর থেকে পাড়ার মসজিদ পর্যন্ত এ সরকার আসার আগেই ডাকাতি হয়েছে। সেই আবেগকে কাজে লাগিয়েও কেউ কেউ ভোটে জিতছে। ভোট ভাগাভাগিতে সাহায্য করছে। সে যাইহোক,আমি জানি সংবিধান আমাকে যে অধিকার দিয়েছে তার জন্য বারবার কোর্টে যেতে হয়। ফলে আমি বাসে,ট্রেনে যা দেখেছি তা আমাকে শিখিয়েছে শুধু।
আমি স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে যা দেখেছি তাতে রঙ বদল আমার কাছে কিছুই না। বরং আমরা সমাজ বদলের কথা ভাবতে পারতাম। আমি জানি এদেশে দলিতের মেধা,নারীদের চরিত্র, মুসলমানদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠবে।আমার মনে হয়েছে ঘুন ধরা একটা সাম্প্রদায়িক সমাজে কেউ কেউ চিনির মোড়ক লাগিয়ে রেখেছে। নির্বাচন তো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত। ফলে সমাজে যে সংখ্যাগরিষ্ঠের ছাপ পড়ে আছে তার সাথে রাজনৈতিক পালাবদল আসলে অবাক হওয়ার মতন কিছুই নেই। যেটা মনের ভেতরে ছিলো সেটা নির্বাচনের ইভিএম এ দেখা গেছে। এটা তো হওয়ারই ছিল। আমি হতাশ নই। বরং এটাও একটা শিক্ষা।
এই শিক্ষাটা নিয়েই আমাদের চেষ্টা করতে হবে। যেটা আগে করেছি তা হয়তো আগামীতেও করবো। না পারলে ঘরে ঢুকে যাবো। লেনিনের মূর্তিতে রঙ মাখানো নিয়ে খবর আসছে। লেনিনের মূর্তিতে লেগে থাকা রঙ সৃজন মোছাচ্ছে। মানে লেনিনকে সেটা চেনানো হয়নি। এ দায় তো আমাদেরই। যদি চেনাতে পারতাম তাহলে তো মানুষ রাস্তায় নামতো। যারা রঙ মাখিয়েছে তাদের মুখে মানুষ কালি লেপে আসতো। আমি মীর রাকেশ রৌশান। বাবার নামের শেষে ইসলাম আছে মায়ের নামের শেষে বেগম। এই মাঝ বয়স পর্যন্ত যা দেখেছি তাতে মন থেকে মানসিক সবটারই পরিবর্তন হয়েছে। ছিন্নভিন্ন হয়েছে সব।
এইটুকু বয়সে প্রেম থেকে বিপ্লব কি না দেখলাম। পড়তে পড়তে শিখেছি। পুড়তে পুড়তে শিখছি। সবটাই ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর বাকি আছে বলতে একটা বাড়ি। খুব জোর হলে সেটাতে বুলডোজার চলতে পারে। এর বাইরে আর কি হতে পারে? ফলে যাদের হাহুতাশ আছে তারা সুস্থ থাকুন। লড়াইয়ে থাকুন। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে যতটা পারবেন থাকুন।বেঁধে বেঁধে থাকুন। বিশেষ করে সংসদীয় বামপন্থী বা স্বাধীন বামপন্থী, মানবাধিকার কর্মী, ধর্ম নিরপেক্ষ উদার চিন্তার মানুষ, গণ আন্দোলন কর্মী, পরিবেশ এবং জেন্ডার নিয়ে যারা কাজ করেন তাঁদের বেঁধে বেঁধে থাকাটা খুবই জরুরি। আমি এখনও যতটুকু পারবো আপনাদের পাশেই থাকার চেষ্টা করবো। আর কি বলি...