আওয়ার টাইমস নিউজ।
সম্পাদকীয় কলামঃ একটি জাতির স্বাধীনতা শুধু তার ভূখণ্ডের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সেই দেশের মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে এবং গণমাধ্যম সত্য প্রকাশের সুযোগ পায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর কোনো ফ্যাসিবাদী শাসক কখনো স্বাধীন গণমাধ্যমকে পছন্দ করেনি। কারণ স্বাধীন গণমাধ্যমই হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
ফ্যাসিবাদের প্রথম লক্ষ্য থাকে জনগণের কণ্ঠরোধ করা, আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। তাই দেখা যায়, যখনই কোনো দেশে কর্তৃত্ববাদী বা একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে, তখনই সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সংবাদপত্র বন্ধ, মামলা, গ্রেপ্তার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বেড়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন সময়ে ভিন্নমত দমনের জন্য গণমাধ্যমকে চাপে রাখার চেষ্টা হয়েছে। অনেক সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে হয়রানি, নির্যাতন এবং সামাজিক-রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। কিন্তু তবুও সত্যের কলম থেমে থাকেনি। কারণ সত্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা গেলেও চিরদিনের জন্য বন্দি রাখা যায় না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন,
"তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং সত্য সাক্ষ্য প্রদান করো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায়।" (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্য বলা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি ঈমানের অংশ। একজন প্রকৃত সাংবাদিক যখন সত্য তুলে ধরেন, তখন তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশন করেন না, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব পালন করেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।" (সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিসের আলোকে আমরা বুঝতে পারি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করা ইসলামের দৃষ্টিতেও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা কেবল গণতান্ত্রিক দায়িত্ব নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বাহ্যিক চাপ নয়, অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও। সাংবাদিক সমাজ যখন বিভিন্ন মত, দল বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন স্বাধীনতার সংগ্রাম দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সত্যের পক্ষে সম্মিলিত অবস্থান গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণেই আজ ঐক্যের বিকল্প নেই। সম্পাদক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংবাদপত্র মালিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিক নিরাপত্তা এবং সত্য প্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।
একটি জাতির বিবেক হলো তার স্বাধীন গণমাধ্যম। আর সেই বিবেক যদি ভীত, বিভক্ত বা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে জবাবদিহিহীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে স্বাধীন গণমাধ্যম ধ্বংস হওয়ার পর সমাজে দুর্নীতি, অবিচার এবং স্বৈরতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি গণমাধ্যম, যা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে কথা বলবে। এমন একটি সাংবাদিক সমাজ, যারা সত্যের প্রশ্নে আপস করবে না। এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু মনে করা হবে না, বরং গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো আন্দোলনও নয়। ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সচেতন জনগণ। কারণ সত্যের আলো জ্বলে উঠলে মিথ্যার অন্ধকার টিকে থাকতে পারে না।
তাই সময়ের দাবি একটাই, স্বাধীন গণমাধ্যম রক্ষায় সকল সাংবাদিক, সম্পাদক এবং গণতন্ত্রকামী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কারণ ঐক্যবদ্ধ কলমের শক্তি বন্দুকের শক্তির চেয়েও বেশি। আর যে জাতি তার গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে পারে, সেই জাতিই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
লেখক: হুসাইন আল আজাদ
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী