আওয়ার টাইমস নিউজ।
নিউজ ডেস্ক: প্রায় দুই দশকের নির্বাসনজীবন শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলেছে, জনমত জরিপের পূর্বাভাস সত্যি হলে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন ৬০ বছর বয়সী এই শান্তস্বভাব নেতা-যেমনটি একসময় বাংলাদেশ শাসন করেছিলেন তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
রয়টার্স জানায়, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সপরিবারে লন্ডন গমন করেছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার পরপরই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় বীরোচিত সংবর্ধনা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার পালাবদল
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
এই রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়েই দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিস্ময়কর কামব্যাক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে রয়টার্স।
পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক শক্তিশালী পরিবারের উত্তরসূরি। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রপতি। তার মা বেগম খালেদা জিয়া দুইবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন।
রয়টার্স লিখেছে, একসময় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া+-এই দুই নেত্রীই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে এখন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তারেক রহমান আবার ইতিহাসের কেন্দ্রে ফিরে আসছেন।
নতুন কূটনীতি ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি:
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে সাজাতে চান। তার লক্ষ্য, বিনিয়োগ বাড়ানো, কিন্তু কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।
এই নীতি শেখ হাসিনার সময়কার কৌশল থেকে ভিন্ন বলে মন্তব্য করেছে রয়টার্স, যেখানে ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট ছিল।
তারেক রহমান আরও প্রতিশ্রুতি দেন, দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, খেলনা, চামড়া ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা, তার ভাষায়, এসব উদ্যোগ স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে সহায়ক হবে। দ্রুত বদলে যাওয়া জীবন কার্ডিওলজিস্ট স্ত্রী ও ব্যারিস্টার কন্যা জায়মা রহমানকে নিয়ে দেশে ফেরার পর সময় কিভাবে কেটে গেছে-তা নিজেও বুঝতে পারেননি বলে জানান তারেক রহমান। বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা দেশে আসার পর প্রতিটি মিনিট কিভাবে কেটেছে, আমি নিজেও জানি না।”
ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষাজীবন
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি বস্ত্র ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। রয়টার্স জানায়, দেশে ফিরে তিনি নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট যিনি অতীতের নিপীড়ন ভুলে সামনে তাকাতে চান। প্রতিশোধ নয়, স্থিতিশীলতা
তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “প্রতিশোধে কী আসে? প্রতিশোধের কারণে মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়। এতে কোনো ভালো কিছু হয় না। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।” মামলা, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক দুর্নীতি মামলার মুখোমুখি হন এবং অনুপস্থিতিতেই দণ্ডিত হন। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছিলেন।
হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সব মামলায় তিনি খালাস পান।
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি দেখেছেন, বিএনপি একের পর এক নির্বাচনে কোণঠাসা হয়েছে, শীর্ষ নেতারা কারাগারে গেছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন দলীয় কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সংযত রাজনীতি ও নতুন বার্তা দেশে ফেরার পর তারেক রহমান সংযত ও পরিমিত ভাষায় কথা বলছেন। উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে তিনি বারবার সমঝোতা ও ঐক্যের কথা বলছেন। তিনি ‘রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা’ ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন-যা বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ভাইরাল বিড়াল ‘জেবু’ রয়টার্সের প্রতিবেদনে একটি ব্যতিক্রমী দিকও উঠে এসেছে। তারেক রহমানের পরিবারের আদুরে সাইবেরিয়ান জাতের বিড়াল ‘জেবু’ সামাজিক ঐযোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তার মেয়ে জায়মা রহমান বলেন, “ওর বয়স সাত বছর। ও আধা সাইবেরিয়ান।”
দলের ভেতরে দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ, দলীয় সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনি কৌশল ও জোট আলোচনা-সবকিছুই তারেক রহমান সরাসরি তদারকি করছেন। বিদেশে থেকেও তিনি এসব করতেন, তবে এখন তা আরও দৃশ্যমান।0তারেক রহমানের ভাষায়,0“গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।”তিনি বলেন,“গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি। গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়। তাই আমরা আমাদের দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে চাই।”
সূত্রঃ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বার্তা সংস্থা রয়টার্স