আওয়ার টাইমস নিউজ।
বিশেষ সম্পাদকীয় কলামঃ হুসাইন আল আজাদ ইবনে নোয়াব
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস হলো ভয়াবহ ও বহু ঝড়-ঝাপটার ইতিহাস। পূর্বের বহু উত্থান-পতন, প্রতিশোধ, অবিশ্বাস এবং বিভাজনের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন এদেশের দেশপ্রেমী সচেতন নাগরিকরা শুধু সরকারই পরিবর্তন চায় না, বরং তারা চায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। এই প্রেক্ষাপটে জনাব তারেক রহমানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কৌশল ও ভূমিকা ভূমিকা নতুন করে আমাকে আশাবাদী করে তুলছে, এবং স্বপ্ন দেখিয়ে এই বিষয়ে কিছু লিখতে ভীষণভাবে উৎসাহিত করেছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেছি, তিনি জনাব তারেক রহমান, নিজেকে সবদিক থেকে যথেষ্ট সংযত রেখেছেন। ২০ বছর আগের তারেক রহমান, এবং বর্তমান তারেক রহমানের মধ্যে আমি বিশাল পার্থক্য লক্ষ্য করছি, যেমন-তার বক্তব্যের মাধ্যমে আবেগের উচ্ছ্বাস নেই, প্রতিপক্ষকে আক্রমণের তীব্রতা নেই, আছে সাবধানী ও মাপা মনমুগ্ধকর বিশুদ্ধ শব্দের ব্যবহার, অর্থাৎ তিনি এমন কোন শব্দ ব্যবহার করছেন না, যেই শব্দ দ্বারা তার প্রতিপক্ষ ব্যথিত অথবা উত্তেজিত হবেন, দীর্ঘ ২০ বছর পর রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, নেতৃত্ব মানে শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; নেতৃত্ব মানে আত্মনিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের মতো সংবেদনশীল রাজনৈতিক পরিবেশে এটি ছোট বিষয় নয়। বরং আমি এটিকে তার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখি। তারেক রহমানকে আমার কূটনৈতিকভাবেও খুব সূক্ষ্ম কৌশলী মনে হয়েছে। নির্বাচনের পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল একটি বার্তা, সংঘাত নয়, সংলাপ। এটি প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এমন আচরণ নেতৃত্বের পরিপক্কতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। একজন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী যদি নিজের ভাষা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, সেটিই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। জনপ্রিয়তা অর্জন করা এক বিষয়, টিকে থাকা আরেক বিষয়। বাংলাদেশের মানুষ বহুবার আশা দেখেছে, আবার হতাশ হয়েছে। তাই আজ যারা স্বপ্ন দেখছে, তারা শুধু কথায় সন্তুষ্ট নয়, তারা প্রমাণ চায়।
জনাব তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় মহাগুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো এখানেই। যেমন, দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব, এই পুরোনো রোগ যদি আবার মাথাচাড়া দেয়, তবে ব্যক্তিগত সংযম কোনো কাজে আসবে না। জনগণ এখন আগের চেয়েও অনেক অনেক বেশি সচেতন। তারা জানে, একজন নেতা তখনই সত্যিকারের নেতা হন, যখন তিনি নিজের অনুসারীদের সর্বোচ্চ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যখনই কোন নেতা নিজের অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন, ঠিক তখনই জুলাই এর মত বিপ্লব আবশ্যকীয়ভাবে তৈরি হয়। আমি নিশ্চিত আমি এবং আশাবাদী যে, তারেক রহমান জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই মাথায় রেখেছেন।
আমি মনে করি, তারেক রহমানের সামনে এখন ঐতিহাসিক সুযোগ আছে। তিনি চাইলে প্রমাণ করতে পারেন যে নতুন প্রজন্মের রাজনীতি মানে জবাবদিহি। এমপি, মন্ত্রী, স্থানীয় নেতা, যেই হোক, অনিয়ম করলে ছাড় পাবে না, এই বার্তাটি বাস্তবে রূপ দিতে হবে। দলীয় পরিচয় দিয়ে অপরাধ রক্ষা করা যাবে না।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি গভীর। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভাষা ও আচরণে দায়িত্বশীল হতে হবে। বিভাজন নয়, সম্মান, এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক আচরণে আমি যে পরিবর্তন দেখেছি, সেটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু ইতিহাস বলে, আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে কঠোর সিদ্ধান্ত লাগে। কঠোরতা মানে প্রতিহিংসা নয়; কঠোরতা মানে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা।
আজ বাংলাদেশের মানুষ এমন একজন নেতৃত্ব চায়, যিনি ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখবেন। যদি তিনি নিজের দলের ভেতর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে পারেন, এবং প্রশাসনকে দলীয় নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, তবে আগামী দশকে বাংলাদেশ স্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
স্বপ্ন দেখানো সহজ। স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। তারেক রহমান এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন যে তিনি সংযত ও কৌশলী হতে পারেন। এখন তাকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি কঠোরও হতে পারেন, যখন রাষ্ট্রের স্বার্থ তা দাবি করে।
এখন বাংলাদেশের সকল নাগরিক তাকিয়ে আছে সুকৌশলী জনাব তারেক রহমানের সুশৃংখল শান্তিপূর্ণ নেতৃত্বের দিকে।