লেখকঃ হুসাইন আল আজাদ ইবনে নোয়াব আলী
আওয়ার টাইমস নিউজ।
ইসলামি জীবন ডেস্ক: মানুষ দুনিয়ার জীবনে সম্পদ জমায় নিরাপত্তার জন্য, স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু যে সম্পদ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় হয় না, যে সম্পদে গরিবের হক আদায় করা হয় না, সেই সম্পদই এক সময় মানুষের জন্য নিয়ামত না হয়ে আজাবের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে যাকাত কেবল একটি আর্থিক বিধান নয়, এটি ঈমান, দায়িত্ববোধ, মানবতা ও আল্লাহভীতির একটি উজ্জ্বল পরীক্ষা। একজন মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু নিজের সম্পদের মধ্যে আল্লাহ নির্ধারিত হক আদায় না করলে তার আমলের ভেতরে এক গভীর ত্রুটি থেকে যায়। কুরআনুল কারিম ও সহিহ হাদিসে যাকাত আদায় না করার ব্যাপারে এমন ভয়াবহ সতর্কবাণী এসেছে, যা যে কোনো মুমিনের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা যাকাতের মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করেন, সমাজকে ভারসাম্য দেন এবং বান্দার অন্তরকে কৃপণতা থেকে মুক্ত করেন। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে যাকাত আদায় করে না, সে মূলত নিজের সম্পদকেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী বানায়।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
يَوْمَ يُحْمَىٰ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ ۖ هَٰذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ
যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যেদিন জাহান্নামের আগুনে সেগুলো উত্তপ্ত করা হবে, অতঃপর তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্বদেশ ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। বলা হবে, এটাই সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করেছিলে। সুতরাং এখন আস্বাদন কর তোমরা যা জমা করে রেখেছিলে। সূরা আত তাওবা, আয়াত ৩৪ থেকে ৩৫।
এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ স্পষ্ট করেছেন, এখানে শুধু সম্পদ রাখা নিন্দিত নয়, বরং যে সম্পদের হক আদায় করা হয় না, সেটিই ধ্বংসের কারণ। অর্থাৎ স্বর্ণ, রৌপ্য বা অর্থ নিজের কাছে থাকা নিজে গুনাহ নয়, কিন্তু ফরজ যাকাত আদায় না করে তা আটকে রাখা মারাত্মক অপরাধ। এই আয়াতে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত সম্পদ দিয়ে কপাল, পার্শ্বদেশ ও পিঠ দগ্ধ করার যে চিত্র এসেছে, তা আসলে কৃপণ হৃদয়ের অন্তর্গত রোগকে প্রকাশ করে। মানুষ দুনিয়ায় সম্পদকে বুকের কাছে টেনে রাখে, আর আখিরাতে সেই সম্পদই আগুন হয়ে তার শরীরে ফিরে আসে। এটা শুধু শাস্তির বর্ণনা নয়, বরং সম্পদের প্রতি অন্ধ আসক্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর কঠোর ঘোষণা।
আরেক আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَهُمْ ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَهُمْ ۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُوا بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন, তাতে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন কখনো মনে না করে যে এটা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং এটা তাদের জন্য অকল্যাণকর। কিয়ামতের দিন তারা যা নিয়ে কৃপণতা করেছে, তাই তাদের গলায় বেড়ি পরানো হবে। সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮০।
এই আয়াতের বিশ্লেষণ অত্যন্ত গভীর। দুনিয়ার দৃষ্টিতে অনেকেই মনে করে, যাকাত না দিলে সম্পদ কমবে না, বরং জমবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করছেন, যে সম্পদে কৃপণতা করা হচ্ছে, সেটাই আসলে কল্যাণ নয়, অকল্যাণ। বাহ্যিক হিসাবে টাকা বেঁচে গেলেও আখিরাতের হিসাবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল। মানুষের চোখে যা সঞ্চয়, আল্লাহর বিচারে তা অপরাধের বোঝা। কিয়ামতের দিন এই সম্পদ গলায় বেড়ি হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, যে জিনিসকে মানুষ নিজের সম্মান, মর্যাদা ও শক্তি ভাবছিল, সেটাই তাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবে।
হাদিস শরিফে এ বিষয়ে আরও হৃদয়বিদারক সতর্কতা এসেছে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُ بِلَهْزِمَتَيْهِ يَعْنِي شِدْقَيْهِ ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ
আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন, আর সে তার যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টাকমাথা বিষধর সাপের রূপ দেওয়া হবে। তা তার গলায় পেঁচিয়ে যাবে, তারপর তার দুই চোয়াল কামড়ে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চয়।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বোঝা যায়, আখিরাতে সম্পদ কোনো নির্জীব বস্তু হিসেবে থাকবে না, বরং আল্লাহর হুকুমে তা শাস্তির জীবন্ত উপকরণে পরিণত হবে। মানুষ যে অর্থকে নিজের নিরাপত্তা বলে ভেবেছিল, সেটাই তার গলায় জড়িয়ে ধরবে। এখানে সাপের চিত্র শুধু ভয় সৃষ্টি করার জন্য নয়, বরং এটা কৃপণতার আধ্যাত্মিক পরিণতির প্রতীকও। কৃপণতা মানুষের অন্তরকে বিষাক্ত করে, আর আখিরাতে সেই বিষ দৃশ্যমান আজাবে রূপ নেয়। যে সম্পদ দুনিয়ায় শান্তি দেওয়ার কথা ছিল, যাকাত না দেওয়ার কারণে তা আতঙ্কের সঙ্গী হয়ে যায়।
সহিহ মুসলিমে আরও এসেছে, শুধু স্বর্ণ বা অর্থ নয়, যেসব ব্যক্তির উট, গরু, ছাগল বা ভেড়ার যাকাত বাকি থাকবে, কিয়ামতের দিন সেসব প্রাণীই তাকে পায়ের আঘাত ও শিংয়ের গুঁতায় শাস্তি দেবে। হাদিসে এসেছে
مَا مِنْ صَاحِبِ إِبِلٍ وَلَا بَقَرٍ وَلَا غَنَمٍ لَا يُؤَدِّي حَقَّهَا إِلَّا أُقْعِدَ لَهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقَاعٍ قَرْقَرٍ تَطَؤُهُ بِأَخْفَافِهَا وَتَنْطَحُهُ بِقُرُونِهَا
যে ব্যক্তি উট, গরু বা ছাগল ভেড়ার হক আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তাকে এক সমতল ময়দানে বসানো হবে। তারপর সেগুলো তাকে তাদের খুর দিয়ে পদদলিত করবে এবং শিং দিয়ে আঘাত করবে।
এই হাদিস আমাদের শিখায়, যাকাত না দেওয়া শুধু টাকার হিসাবের গরমিল নয়, এটি আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার আত্মসাৎ করা। একজন মানুষ হয়তো ভেবেছে, তার পশুসম্পদ, ব্যবসা বা সঞ্চয় তার ব্যক্তিগত মালিকানা। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, এর মধ্যে গরিবের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার অস্বীকার করা মানে নিজের মালিকানার সীমানা অতিক্রম করা। এজন্যই আখিরাতে তার নিজের সম্পদ থেকেই তার বিচার শুরু হবে। সম্পদ তখন আর আশ্রয় দেবে না, বরং আল্লাহর দরবারে অভিযোগকারী হয়ে দাঁড়াবে।
ইসলামের ইতিহাসেও যাকাতের গুরুত্ব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর যখন কিছু মানুষ যাকাত আদায়ে গাফিলতি ও অস্বীকৃতির পথ ধরেছিল, তখন খলিফাতুর রাসুল আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নামাজ ও যাকাতকে আলাদা করে দেখা যাবে না। কারণ যাকাত ইসলামের মৌলিক বিধান, এটি কেবল অর্থনৈতিক দান নয়, বরং দ্বীনের প্রকাশ্য নিদর্শন। এই ঐতিহাসিক অবস্থান প্রমাণ করে, যাকাত বর্জনকে সাহাবায়ে কিরাম সাধারণ ত্রুটি হিসেবে দেখেননি, বরং তা উম্মাহর ঈমানি ও সামাজিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
যাকাত আদায় না করার ভয়াবহতা শুধু আখিরাতের শাস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়, এর দুনিয়াবি প্রভাবও গভীর। যখন ধনীরা যাকাত দেয় না, তখন দরিদ্রের হক বঞ্চিত হয়, সমাজে বৈষম্য বাড়ে, ক্ষোভ জন্মায়, হৃদয়ে হিংসা তৈরি হয়, এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ইসলাম যাকাতের মাধ্যমে সম্পদকে সমাজে সঞ্চালিত করতে চায়, যাতে অভাবগ্রস্ত মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় এবং মুসলিম সমাজে সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই যাকাত কেবল একজন ব্যক্তির ইবাদত নয়, এটি পুরো সমাজকে সুস্থ রাখার একটি দিভ্য ব্যবস্থা। যে ব্যক্তি যাকাত আটকে রাখে, সে শুধু নিজের আখিরাত নয়, সমাজের কল্যাণও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শরিয়তে নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা এবং তার ওপর নির্ধারিত মেয়াদ অতিবাহিত হওয়া শর্ত। তাই যার ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে, তার জন্য এটি বিলম্ব করা, অবহেলা করা বা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া কোনো হালকা বিষয় নয়। সহিহ সূত্রে যাকাতের বিধান, সম্পদের ধরন এবং তার হক আদায়ের বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ফলে একজন মুমিনের কর্তব্য হলো বছরে বছরে নিজের সম্পদের হিসাব নেওয়া, আলেমদের পরামর্শে সঠিক যাকাত নির্ধারণ করা এবং দ্রুত তা আদায় করে দেওয়া।
সবশেষে কথা একটাই। যাকাত না দেওয়া মানে কেবল টাকা না দেওয়া নয়, বরং আল্লাহর হুকুম অমান্য করা, গরিবের হক আটকে রাখা, নিজের অন্তরকে কৃপণতার আঁধারে ঢেকে ফেলা এবং আখিরাতের জন্য আগুন সঞ্চয় করা। যে সম্পদ মানুষ এত যত্নে জমায়, সেটাই যদি কিয়ামতের দিন আগুন, সাপ, বেড়ি ও শাস্তিতে পরিণত হয়, তাহলে তার চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত, দেরি না করে নিজের সম্পদকে পবিত্র করা, যাকাত আদায় করা, আর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে দুনিয়ার সাময়িক সঞ্চয়ের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। কারণ যে সম্পদ আল্লাহর পথে বের হয়ে যায়, সেটাই আসলে রক্ষা পায়। আর যে সম্পদ আল্লাহর হক আটকে রেখে জমা রাখা হয়, সেটাই ধ্বংসের বীজ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে যাকাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।