
আওয়ার টাইমস নিউজ।
এক্সক্লুসিভ সম্পাদকীয় কলামঃ হুসাইন আল আজাদ
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন যুদ্ধের গুঞ্জন, তখন একটি প্রশ্ন সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে নাড়া দিচ্ছে, একটি শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র যদি বহিরাগত সামরিক আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এর পরিণতি কোথায় গিয়ে থামবে? এটি কি শুধু একটি দেশের সংকট, নাকি সমগ্র উম্মাহর জন্য সতর্কবার্তা?
ইরান বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উত্তেজনার মুখে টিকে ছিল। তারা ছিল একটি শক্ত প্রতিরোধের প্রতীক, সমর্থন বা বিরোধিতা যাই থাকুক, বাস্তবতা হলো তারা আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। যদি সেই স্তম্ভ ভেঙে পড়ে, তাহলে শক্তির ভারসাম্যে বড় শূন্যতা তৈরি হবে। ইতিহাস বলে, শূন্যতা কখনো ফাঁকা থাকে না; বড় শক্তিগুলো দ্রুত সেই স্থান পূরণ করে।
কিন্তু এখানে আরও বড় প্রশ্ন আছে, মুসলিম বিশ্ব কি ঐক্যবদ্ধ? নাকি আমরা বিভক্ত, পরস্পরের প্রতি সন্দেহপ্রবণ এবং কৌশলগতভাবে নির্ভরশীল?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩)
এই আয়াত শুধু আধ্যাত্মিক নির্দেশ নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও শিক্ষা। বিভক্ত জাতি কখনো শক্তিশালী হয় না। বিভক্ত নেতৃত্ব কখনো মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মুমিনরা পরস্পরের জন্য একটি দেহের ন্যায়; দেহের একটি অংশ ব্যথিত হলে সমগ্র দেহ তা অনুভব করে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আজ যদি কোনো একটি মুসলিম দেশ অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয়, অন্যরা কি সত্যিই সেই ব্যথা অনুভব করছে? নাকি আমরা কেবল বিবৃতি দিচ্ছি, কিন্তু বাস্তব ঐক্য গড়ে তুলতে পারছি না?
এখানে আতঙ্ক ছড়ানো উদ্দেশ্য নয়। বরং বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। সামরিক শক্তিতে বড় না হলেও ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে দেশটি উপেক্ষিত নয়। যদি বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্ব তীব্র হয় এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে, তখন ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক চাপে পড়তে পারে। কিন্তু সমাধান কি কেবল ভয়? না। সমাধান হলো ঐক্য, কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং আত্মশক্তি বৃদ্ধি।
মুসলিম বিশ্বের এখনই সময়, পারস্পরিক বিরোধ কমিয়ে ন্যূনতম যৌথ অবস্থান তৈরি করা। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব, মানবিক মর্যাদা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এক হওয়া দরকার। ঐক্য মানে যুদ্ধ নয়। ঐক্য মানে কূটনৈতিক সমন্বয়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং নৈতিক অবস্থান। যখন একটি অঞ্চল নিজের ভেতরে শক্ত ভিত্তি তৈরি করে, তখন বাইরের চাপ কম কার্যকর হয়।
আজকের পৃথিবীতে শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়; শক্তি হলো অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি এবং জনমত। যদি মুসলিম দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে কোনো বাহ্যিক শক্তিই সহজে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু মহা দুর্ভাগ্যে মুসলিম উম্মাহর” ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার লোভে অনৈতিকভাবে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একমাত্র মুসলিম দেশ ইরান ছাড়া নি/র্লজ্জ মুসলিম বিশ্ব নেতারা পশ্চিমা বিশ্বের চাটুকারিতা করছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা কি বিভক্ত থাকব? নাকি ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে নতুন পথ বেছে নেব? আমরা কি কেবল আবেগে প্রতিক্রিয়া জানাব, নাকি বাস্তব ঐক্য গড়ে তুলব?
আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন বিভক্তির পরিণতি সম্পর্কে। ঐক্যবদ্ধ হওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি ঈমানের অংশ, আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। সময় এখনই। নইলে ইতিহাস অপেক্ষা করবে না।





























