
আওয়ার টাইমস নিউজ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: অ্যান্টার্কটিকার কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফের স্তরের নিচে লুকিয়ে থাকা ভূখণ্ডের বিস্ময়কর চিত্র প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। স্যাটেলাইট তথ্য ও পুরো মহাদেশজুড়ে বরফপ্রবাহের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তৈরি এই নতুন মানচিত্রে প্রথমবারের মতো এত বিস্তৃত ও স্পষ্টভাবে বরফের নিচের ভূমির কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে রয়েছে বিশাল পর্বতমালা, গভীর উপত্যকা, ঢেউয়ের মতো উঁচুনিচু ভূমি ও প্রাচীন ভূ-আকৃতি, যেগুলোর অস্তিত্ব এতদিন প্রায় অজানাই ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মানচিত্র আগের যেকোনো গবেষণার তুলনায় বরফের নিচের পৃথিবী সম্পর্কে অনেক গভীর ধারণা দিচ্ছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, বরফ যেভাবে প্রবাহিত হয়, তা অনেকাংশে নির্ভর করে নিচের ভূমি সমতল না পাহাড়ি তার ওপর। এই ধারণার ভিত্তিতে তারা বরফপ্রবাহের গতি ও চাপ বিশ্লেষণ করে নিচের ভূমির সম্ভাব্য আকৃতি নির্ণয় করেছেন। এতে হাজার হাজার বছর আগে গঠিত নানা পাহাড় ও উপত্যকার চিহ্ন উঠে এসেছে।
নতুন মানচিত্রে একাধিক লুকানো পর্বতমালার অবস্থান আগের তুলনায় অনেক স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা গেছে। এসব পর্বত বরফের গতিকে কোথাও ধীর করে, কোথাও আবার দ্রুত প্রবাহিত হতে সাহায্য করে। ফলে ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলার হার কতটা বাড়তে পারে, তা বুঝতে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মানচিত্রটি শতভাগ নিখুঁত নয় এবং কিছু অঞ্চলে এখনও তথ্যগত অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এটি অ্যান্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ আচরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। বরফের নিচের ভূমির প্রকৃতি জানা থাকলে কোন অঞ্চলে বরফ দ্রুত গলবে এবং কোন অংশ তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে, তা আগাম অনুমান করা সম্ভব হবে।
এর আগে বরফের নিচের ভূমি জানার জন্য বিজ্ঞানীরা মূলত স্থলভিত্তিক বা বিমান থেকে চালানো রাডার জরিপের ওপর নির্ভর করতেন। তবে অ্যান্টার্কটিকার কোনো কোনো এলাকায় বরফের পুরুত্ব তিন মাইল পর্যন্ত হওয়ায় এসব জরিপ নির্দিষ্ট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকত। ফলে বিশাল অঞ্চল দীর্ঘদিন অজানাই থেকে গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের অধ্যাপক রবার্ট বিংহাম বলেন, পুরো অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচের ভূমিকে একসঙ্গে দেখতে পাওয়া সত্যিই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। তার ভাষায়, এটি এমন অনুভূতি দেয় যেন বরফে ঢাকা স্কটিশ হাইল্যান্ডস বা ইউরোপীয় আলপসকে দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পুরোনো জরিপগুলোর মধ্যে অনেক সময় কয়েক দশক কিলোমিটার ফাঁক থাকত, যা তথ্যের বড় ঘাটতি তৈরি করত। নতুন স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও উন্নত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই মানচিত্র শুধু অ্যান্টার্কটিকা নয়, পৃথিবীর জলবায়ু ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ পরিবেশগত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা এই অজানা পৃথিবী ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জলবায়ু গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বিবিসি




























