
আওয়ার টাইমস নিউজ।
ডেস্ক রিপোর্ট: আসন্ন স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতার আভাস মিলছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার কৌশল নির্ধারণ করছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিষ্কার করে জানিয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য কার্যক্রমের সুযোগ নেই।
স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে ‘প্রত্যাবর্তনের’ চেষ্টা
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় আবেগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করে রাজনীতির ময়দানে ফেরার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা বিদেশে অবস্থান করেও অনলাইন মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যম ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। লক্ষ্য হলো, ২৬ মার্চের আশপাশে জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় প্রতীকী উপস্থিতির মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।
তবে পুলিশ প্রশাসন ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এমন কোনো কর্মসূচি অনুমোদনের প্রশ্নই ওঠে না। একই অবস্থান নিয়েছে জুলাইয়ের আন্দোলনে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোও। ফলে স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় সাংস্কৃতিক উইং
মাঠে সরাসরি কার্যক্রম সীমিত থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বেশ সক্রিয়। বিভিন্ন ভিডিও, গান ও চিত্রায়নের মাধ্যমে তারা জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বয়ান ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এসব কনটেন্টে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, গণভবন ও ৩২ নম্বর সংক্রান্ত দৃশ্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
মাঠপর্যায়ে ‘অফিস খোলার’ চেষ্টা
গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আগে সিলগালা বা পরিত্যক্ত দলীয় কার্যালয় পুনরায় খোলার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৩৯টি স্থানে প্রতীকীভাবে কার্যালয় খোলার ঘটনা ঘটেছে বলে তথ্য মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাজশাহী, যশোর, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ একাধিক জেলায় ঝটিকা মিছিল ও পতাকা উত্তোলনের চেষ্টার দৃশ্য দেখা গেছে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে ভোররাতে ভাঙা গেটের সামনে কয়েকজন নারী কর্মী স্বল্প সময় অবস্থান করে স্লোগান দিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। গুলিস্তানের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ২৬ মার্চের আগেই অন্তত একবার করে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় উপস্থিতির বার্তা দিতে চায় দলটি।
বিদেশ থেকে নির্দেশনা ও কৌশল
সূত্র জানায়, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনলাইন মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পলাতক কিছু নেতাকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই কৌশলের মাধ্যমে কারাগার ও আদালতকেন্দ্রিক আবেগ সৃষ্টি, ‘মজলুম’ ভাবমূর্তি তৈরি এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জনমত গঠনের চেষ্টা করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মিডিয়া ট্রায়াল ও সাদ্দাম ইস্যু
সম্প্রতি বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে এসেছে। তার পরিবারিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেভাবে কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে আবেগঘন বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, সেটিকে একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই ঘটনার জেরে সরকারকেও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিতে হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতেও এমন কৌশল ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক লবিং ও কূটনৈতিক যোগাযোগ
রাজনীতির মাঠের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তৎপরতা বাড়িয়েছে আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাবশালী নেতা। সাবেক স্পিকার ও সাবেক মন্ত্রীরা ভারত ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে। তাদের বয়ান হলো, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দ্রুত রাজনীতিতে ফেরার পথ তৈরি করাই এই তৎপরতার মূল লক্ষ্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা নিয়ে সদ্যবিদায়ী আইজিপি বাহারুল আলম স্পষ্ট করে বলেছেন, আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ কোনো দলের কার্যক্রমের সুযোগ নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বিষয়টি পুরোপুরি আইনের আওতায় দেখা হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান এখনো চূড়ান্ত নয়
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করেছে। পর্যবেক্ষণ শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
আইনজ্ঞদের মতে, নিবন্ধন বাতিল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর আদালতের রায় বা সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বাধীনতা দিবসের মতো আবেগঘন দিনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা উল্টো প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।





























