
আওয়ার টাইমস নিউজ।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট-যেখানে প্রতিদিন মানুষ পার হয় নতুন স্বপ্ন নিয়ে, সেই ঘাটই হঠাৎ এক বিকেলে পরিণত হলো মৃত্যুর মিছিলে। এক ভয়াবহ বাসডুবির ঘটনায় ঝরে গেল একাধিক প্রাণ। তাদের মধ্যেই ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান- যার জীবন থেমে গেল ঠিক তখনই, যখন সে স্বপ্নের ডানা মেলতে শুরু করেছিল।
ঈদের আনন্দ শেষে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিলেন রাইয়ান। পাশে ছিলেন তার মা রেহানা আক্তার, চিকিৎসক বোন ডা. নুসরাত জাহান এবং ছোট্ট ভাগনে তাজবিদ। কিন্তু সেই ফেরাটা আর শেষ হলো না। দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি হঠাৎ করেই তলিয়ে যায় পদ্মার গভীর জলে। মুহূর্তেই আনন্দ ভরে থাকা একটি পরিবার ডুবে যায় অন্ধকারে।
রাইয়ান, তার মা এবং ছোট্ট তাজবিদ আর ফিরে আসেননি। বেঁচে ফিরেছেন শুধু বোন নুসরাত-কিন্তু তার চোখে এখন শুধু শূন্যতা। একসঙ্গে হারিয়েছেন মা, ভাই আর নিজের সন্তানকে। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল, সচেতন ও দায়িত্বশীল তরুণ। স্কুলজীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন বিতর্কচর্চায়, জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে অর্জন করেছিলেন সাফল্য। বিশ্ববিদ্যালয়েও যুক্ত ছিলেন বিতর্ক আন্দোলনের সঙ্গে-যুক্তি আর জ্ঞানের আলোয় সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার।
শুধু শিক্ষাঙ্গনেই নয়, সামাজিক আন্দোলনেও ছিলেন সক্রিয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন তরুণদের অনুপ্রেরণা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, সমাজকে ভালো কিছু দেওয়ার চেষ্টা— এগুলোই ছিল তার জীবনের পথচলা।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা সেই পথ থামিয়ে দিল এক মুহূর্তে।
দুর্ঘটনার রাতেই নিথর দেহগুলো পৌঁছে যায় বাড়িতে। চারদিকে তখন শুধু কান্না, আহাজারি আর ভেঙে পড়া স্বজনদের আর্তনাদ। কিছুদিন আগেই বাবাকে হারিয়েছিল এই পরিবার। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার এমন ভয়াবহ আঘাত-যেন দুঃখ একের পর এক এসে গ্রাস করছে তাদের জীবন।
বন্ধু-সহপাঠীদের কণ্ঠেও একই হাহাকার। তারা বলছেন, রাইয়ান শুধু একজন মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না, ছিলেন স্বপ্ন দেখাতে জানেন এমন একজন মানুষ। তার স্বপ্ন ছিল বড় কিছু করা, দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করা।
স্থানীয় সংগঠনের নেতারাও বলছেন, রাইয়ান ছিল এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। তার মতো একজন তরুণের এভাবে চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল-অব্যবস্থাপনা আর অবহেলার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। পদ্মার ঢেউ আজ শুধু পানি নয়, বহন করছে অগণিত স্বপ্নভঙ্গের গল্প।
প্রশ্ন রয়ে যায়— আর কত রাইয়ান এভাবে হারিয়ে যাবে? আর কত মা, ভাই, সন্তানকে হারিয়ে নিঃস্ব হবে পরিবার?
মানুষ এখন উত্তর চায়, বিচার চায়-যেন আর কোনো স্বপ্ন এভাবে মাঝপথে থেমে না যায়।



























