
আওয়ার টাইমস নিউজ।
ডেস্ক রিপোর্ট: নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সূক্ষ্ম কণা কোটি কোটি বছর ধরে মহাশূন্য পাড়ি দিয়ে চাঁদের পৃষ্ঠে জমা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, সূর্য থেকে নির্গত শক্তিশালী কণাপ্রবাহ বা সোলার উইন্ড এই কণাগুলোকে বহন করে চাঁদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে।
এই আবিষ্কার চাঁদের গঠন ও উপাদান নিয়ে দীর্ঘদিনের এক রহস্যের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। অ্যাপোলো মিশনের সময় চাঁদ থেকে আনা মাটির নমুনায় পানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড, হিলিয়াম ও নাইট্রোজেনের মতো গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এতদিন ধারণা ছিল, এসব উপাদানের বেশিরভাগই সূর্য থেকে এসেছে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এর একটি বড় অংশের উৎস হতে পারে পৃথিবী নিজেই। ২০০৫ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রথম এই ধারণা সামনে আনেন। সে সময় তারা বলেন, প্রাচীন পৃথিবীতে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র না থাকায় বায়ুমণ্ডলের কণা সহজেই মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ত এবং চাঁদের দিকে যেতে পারত।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র এই কণাগুলোর যাত্রা বন্ধ করেনি, বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা আরও সহজ করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রক্রিয়া আজও সক্রিয় রয়েছে।
নিউইয়র্কের রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এরিক ব্ল্যাকম্যান জানান, পৃথিবী দীর্ঘ সময় ধরে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস চাঁদের মাটিতে সরবরাহ করে আসছে। তার মতে, পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে উপাদান বিনিময় কেবল অতীতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা কোটি কোটি বছর ধরে চলমান।
চাঁদের পৃষ্ঠে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের উপস্থিতি ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যতে যদি চাঁদে স্থায়ী মানব বসতি গড়ে ওঠে, তাহলে সেখানকার মাটি থেকেই পানি ও জ্বালানি তৈরির উপাদান সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। এতে পৃথিবী থেকে সব রসদ বহনের প্রয়োজন কমে আসবে।
গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন, একটি প্রাচীন পৃথিবীর, যেখানে চৌম্বক ক্ষেত্র দুর্বল ছিল; অন্যটি বর্তমান পৃথিবীর মতো, যেখানে চৌম্বক ক্ষেত্র শক্তিশালী। ফলাফলে দেখা যায়, বর্তমান পৃথিবীর পরিস্থিতিতেই সবচেয়ে বেশি বায়ুমণ্ডলীয় কণা চাঁদের দিকে প্রবাহিত হয়।
অ্যাপোলো ১৪ ও ১৭ মিশনে সংগৃহীত চাঁদের মাটির নমুনার তথ্য বিশ্লেষণ করেও গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, চাঁদের কিছু উপাদান সূর্য থেকে নয়, সরাসরি পৃথিবী থেকেই এসেছে।
পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র গ্রহটির তরল বাহ্যিক কেন্দ্রে গলিত লোহা ও নিকেলের গতিবিধির ফলে তৈরি হয়। এই ক্ষেত্র সূর্যের ক্ষতিকর কণাপ্রবাহ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার পাশাপাশি একটি লেজের মতো গঠন তৈরি করে, যাকে বলা হয় ম্যাগনেটোটেইল।
পূর্ণিমার সময় চাঁদ কয়েকদিনের জন্য এই ম্যাগনেটোটেইলের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে। তখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে ছিটকে যাওয়া কণাগুলোর চাঁদের দিকে যাওয়ার পথ সহজ হয়ে যায়। চাঁদের নিজস্ব বায়ুমণ্ডল না থাকায় এসব কণা সেখানে গিয়ে সরাসরি মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
গবেষকদের মতে, চাঁদের মাটিতে জমে থাকা এই কণাগুলো পৃথিবীর প্রাচীন বায়ুমণ্ডলের এক ধরনের রাসায়নিক দলিল। এর মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবনের বিকাশ ও পরিবেশগত ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেনতারো তেরাদা বলেন, পৃথিবী ও চাঁদ শুধু ভৌতভাবে নয়, রাসায়নিকভাবেও একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই গবেষণা পৃথিবীর অতীত বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, নতুন এই গবেষণা দেখাচ্ছে, পৃথিবী ও চাঁদের সম্পর্ক কেবল মহাকাশীয় দূরত্বের নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলা এক গভীর উপাদান বিনিময়ের ইতিহাস। যা ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণা ও মানব বসতির সম্ভাবনাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলছে।
সূত্র: CNN




























