
আওয়ার টাইমস নিউজ।
নিউজ ডেস্ক: বিতর্কিত বাউলশিল্পী আবুল সরকার মহারাজ ওরফে আবুল বয়াতি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাসের পরই গান গাওয়া শুরু করেন। খুব অল্প বয়সেই নানা আসরে ধর্ম নিয়ে অপব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন তিনি। পরে বিভিন্ন আসরে নিজেকে কোরআনের ‘তাফসিরকারক’ হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন। ইউটিউব–ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য। সম্প্রতি এক পালাগানের আসরে আল্লাহ, কোরআন ও নবী (সা.)–কে নিয়ে কটূক্তি করলে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং বর্তমানে তিনি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় কারাগারে আছেন।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার চর দিল্লি গ্রামে তার বাড়িতে নিয়মিত ভিআইপি ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ—আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেত না। ধর্ম নিয়ে একের পর এক কটূক্তি করেও তিনি পার পেয়ে যেতেন।
গ্রামবাসী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—দুই সন্তানের জনক আবুল বয়াতি ১০ বছর বয়স থেকেই বাউল গান গাইতেন। স্ত্রী আলেয়া বেগমও বাউলশিল্পী; দু’জন একসঙ্গেই বিভিন্ন আসরে যেতেন। নিজেকে ‘পীর’ পরিচয় দিয়ে বাড়িতে ভক্তদের জড়ো করতেন তিনি। দাবি করতেন—২০০৭ সালে তিনি খেলাফতপ্রাপ্ত। এমনকি নিজের নামের সঙ্গে ‘আল চিশতী নিজামি’ উপাধিও যোগ করেন। তার একটি বয়াতি গানের বইও রয়েছে।
ঢাকাসহ সারাদেশে তার ৫০ হাজারের মতো ভক্ত আছে বলে দাবি করতেন আবুল। শিষ্যের সংখ্যাও নাকি হাজারের বেশি। ভারতে আজমির শরিফ, ওমরা হজ—এসব ভ্রমণের গল্পও শোনাতেন নিয়মিত।
এদিকে সম্পত্তি নিয়ে নিজের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম—যিনি একজন মসজিদের ইমাম—তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। ধর্মীয় বিষয়ে অপব্যাখ্যা দেওয়ার প্রতিবাদ করায় আবুল তাকে নানাভাবে হয়রানি করেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারেও পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন জমি দখল, মহিলা মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া—এসব অভিযোগও ওঠে আবুলের বিরুদ্ধে।
২০১৯ সালে ভাইয়ের আরেকটি ঘর ভেঙে দখল করে নেন তিনি। এতে এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই তিনি গুরুতর চর্মরোগে আক্রান্ত হন, যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে সিঙ্গাপুরেও যান। রোগ না সারায় এখন প্রায়ই সাদা কাপড় পরে থাকতে দেখা যেত তাকে।
আওয়ামী আমলে বিভিন্ন গানের আসরে শেখ মুজিব, শেখ হাসিনা এবং স্থানীয় নেতাদের নামে চাটুকারিতা করতেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পাশাপাশি ধর্ম বিষয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে বহুবার সমালোচিত হন তিনি।
পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে—শান্ত পরিস্থিতিতে এমন কটূক্তি করে তিনি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন কি না। জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
মানিকগঞ্জে বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা
কারাবন্দি আবুলের মুক্তির দাবিতে মানিকগঞ্জে মানববন্ধনে যোগ দিতে আসা বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার অভিযোগে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। আহত শিল্পী জহিরুল ইসলামের বাবা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতিবাদের মুখে বাউলরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
৪ নভেম্বর পালাগানের আসরে ইসলাম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ ওঠার পর ২০ নভেম্বর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ আবুলকে গ্রেপ্তার করে। আদালত ইতোমধ্যে দুই দফায় তার জামিন আবেদন নাকচ করেছে। দেশজুড়ে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
























