বিবাহের মহর প্রসঙ্গে কিছু কথা ও ব্যথা!

0

আওয়ার টাইমস্ নিউজ।
একজন মুসলমানের বিয়েতে আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্দেশিত অপরিহার্য প্রদেয় স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রী যে অর্থ-সম্পদ পেয়ে থাকে তাকেই দেনমোহর বলে।

মহর ধার্যের রহস্য।

মহরের দ্বারা বিয়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রকাশ পায়। মাল ছাড়া বিয়ের গুরুত্ব বুঝা যায়না। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশী আগ্রহী হচ্ছে সম্পদের প্রতি। তাই সম্পদ ব্যয় ছাড়া বিয়ের গুরুত্ব প্রকাশ পায়না।
(কিতাবুন নাওয়াযিল. ৮.৩৯৪)

মহর পরিশোধ করার বিধান।

বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করা স্বামীর উপর ওয়াজিব।
(মাজমাউল আনহুর ১. ৫০৯.দারুল কুতুব, বৈরুত।
মহর নগদ পরিশোধ করা উত্তম, তবে পরেও পরিশোধ করা যাবে।
(কিতাবুন নাওয়াযিল.৮.৪১৬)

মহর সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য।

তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মহর দিয়ে দাও খুশি মনে।
( সুরা নিসা.৪)

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা তাদেরকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য – ব্যভিচারের জন্য নয়।
(সুরা নিসা ২৪)

মহর সম্পর্কে হাদিসের বক্তব্য।

এক, সাহল ইবনে সাদ (রাঃ) বলেন, ‘’আমি অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপবিষ্ট ছিলাম’’। তখন এক মহিলা দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমি নিজেকে আপনার জন্য হেবা করলাম, আপনি আমাকে গ্রহণ করুন। কিন্তু রাসূল (সাঃ) কিছুই বললেন না।
মহিলাটি এরূপ তিনবার বলল, কিন্তু তিনবারই রাসূল (সাঃ) চুপ থাকলেন। তখন এক সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন আপনি যদি গ্রহন না করেন তাহলে এই মহিলার সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন তোমার নিকট কি মহিলাকে দেনমোহর দেওয়ার মত কিছু আছে? তিনি বললেন, না। তখন রাসূল (সা.) বললেন তোমার বাড়ি থেকে খোঁজ করে একটি লোহার আংটি হলেও নিয়ে আসো। কিন্তু তিনি তাও আনতে পারেনি। তখন রাসূল (সা.) বললেন তোমার কি কোরআনের কিছু মুখস্ত আছে? তখন তিনি বললেন আমার ঐ ঐ সূরা মুখস্থ আছে।আমি তোমাকে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিলাম। তাকে কুরআনের ঐ সুরাগুলোই শিক্ষা দেওয়া তোমার দেনমোহর।
অন্য হাদিসে আছে, রাসূল (সা.) বললেন, তোমার কাছে কুরআনের যে অংশ রয়েছে এর বিনিময়ে তোমাকে তার সাথে বিয়ে দিলাম।
(সুনানে ইবনে মাজা ১. হাদিস নং ১৮৮৯)
(জামে তিরমিযী ১.হাদিস নং ১১১৪)

উপরোক্ত হাদীসটি দ্বারা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, মহিলাকে দেনমোহর প্রদান করা অত্যাবশ্যক।
দেনমোহর একজন নারীর হক, যদি কোনো ব্যক্তি দেনমোহর অনাদায়ের ইচ্ছা নিয়ে বিয়ে করে তাহলে সে ব্যাভিচারী হবে।

দুই, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মেয়েকে দেনমোহর দেওয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে, কিন্তু দেনমোহর দেওয়ার ইচ্ছে নেই, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট ব্যাভিচারী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।”-
( মুসনাদে আহমাদ)

তিন,হযরত উমর রা. বলেন মহিলাদের মহরের ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করোনা। কেননা তা যদি দুনিয়াতে সম্মান অথবা অাল্লাহর কাছে তাকওয়ার নিদর্শন হত, তবে মুহাম্মদ সা. তোমাদের মধ্যে এ ব্যাপারে অধিক যোগ্য ও অধিকারী হতেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও মেয়েদের মহর বার উকিয়ার বেশী ধার্য করেননি।(বার উকিয়া চারশত আশি দিরহাম)।
(সুনানে ইবনে মাজাহ ১. হাদিস নং ১৮৮৭)

চার, তবে সুনানে ইবনে মাজার ১৮৮৬ নং হাদিসে ৫০০ দিরহামের কথাও বর্ণিত হয়েছে।

পাঁচ, আম্মাজান আয়েশা রা. এর মহর ছিল ৫০ দিরহাম।
সুনানে ইবনে মাজা.১.হাদিস নং ১৮৯০

ছয়, হযরত উম্মে হাবিবা রা. এর মহর ৪০০ দিনার ছিল। যা হাবশার বাদশাহ নাজাশী পরিশোধ করে দিয়েছিল।
(কিতাবুন নাওয়াযিল. ৮.৪০০-৪০১)
সাত, হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন নিশ্চয়ই একজন নারীর জন্য কল্যাণের লক্ষণ হল, তার বাগদান, মহর, এবং গর্ভ ( সন্তান প্রসব) সবকিছুই সহজ হয়ে যায়।
(মুসনাদে আহমদ)

আট,হযরত আলী রা.থেকে বর্ণিত, সর্বনিম্ন মহর হচ্ছে দশ দিরহাম।
(জামে তিরমিযী ১.পৃঃ ২১১)
এইতো গেল কুরআন ও হাদিসের কথা।

আসুন এবার আমরা নিজেদের সমাজের দিকে তাকাই;

আমাদের সমাজের যারা ধার্মিক নয় তারা মহর ধার্যের ক্ষেত্রে শরীয়তের দিক নির্দেশনার তোয়াক্কা করেনা।
তারা মহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছাড়াছাড়ি নয় বরং বাড়াবাড়ি করে।

যারা দ্বীনদার তারা বেশিরভাগই মহরে ফাতিমী ধার্য করে।
আর মহরে ফাতেমি বলা হয় ঐ পরিমাণ মহর নির্ধারণ করা, যা রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর মেয়ে হযরত ফাতেমা রাঃ-এর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। হযরত ফাতেমা রাঃ-এর মোহর ৫০০ দিরহাম নির্ধারণ করা হয়েছিল, ১৫৩০.৯ গ্রাম রুপা (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া, ৪/৩৫০)।
তাদেরকে মহরে ফাতিমী ধার্য করার হেতু জিজ্ঞেস করলে বলে বরকতের জন্য মহরে ফাতিমী নির্ধারণ করেছি।
আমার প্রশ্ন হল আয়েশা রা. ও উম্মে সালামা রা. মহর ধার্য করতে পারেননা?
তাদের উভয়ের মহরে কী বরকত নেই?
রাসুল সা.ই তো তাদের মহর ৫০
ও দশ দিরহাম ধার্য করেছেন।

তাই বুঝা গেল মহরে ফাতিমী ধার্য করা শরীয়তে কাম্য না।
শরীয়ত কামনা করে মহর ধার্য করা হবে স্বামীর সামর্থ দেখে। যাতে সহজে আদায় করতে পারে। এর জন্য আলাদা কোনো বেগ পেতে না হয়। তাই আমরা বলতে পারি স্বামীর সামর্থ থাকলে মহরে ফাতিমীর চেয়ে বেশী মহর ধার্য করবে। আর মহরে ফাতেমীর সামর্থ থাকলে তাই ধার্য করবে। এরচে কমের সামর্থ থাকলে কমই ধার্য করবে তবে দশ দিরহামের চেয়ে কম নয়। সামর্থ না থাকলেও বরকতের আশায় মহরে ফাতিমী ধার্য করার যুক্তিকতা নেই। কারণ দেনমহর স্ত্রীর হক।

হাদিসে পাকে এরশাদ হয়েছে কবীরা গুনাহর পর সবচে জঘন্যতম গুনাহ হল ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মূত্যুবরণ করা।
মিশকাতুল মাসাবিহ -হাদিস নং ২৯২২.
তাই সামর্থের ভিতরে মহর ধার্য করতে হবে।যেন সহজে আদায় করা যায়। (কিতাবুন নাওয়াযিল- ৮. ৩৯৮)

আর একটা কথা ভালভাবে স্মরণ রাখা দরকার,
বিয়ে যত সহজ হবে ব্যভিচারের দ্বার তত রুদ্ধ হবে।
পক্ষান্তরে বিয়ে যত কঠিন হবে ব্যভিচার তত বাড়বে।
আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার এবং আমল করার তাওফিক দান করুন, আমীন।

[লেখক,মুফতী আব্দুল্লাহ ইদরীস]

একটি মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে