
আওয়ার টাইমস নিউজ।
ইসলামী জীবন ডেস্ক: একটি ক্ষণিকের অন্যায় দৃষ্টি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ধ্বংসের কারণ হতে পারে। এই দৃষ্টি মানুষের বছরের পর বছর ধরে জমানো নেক আমলগুলোকে একপলকে নষ্ট করে দেয়। আজ যে চোখ অবলীলায় আল্লাহর নিষেধ করা দৃশ্যের দিকে তাকাচ্ছে, কাল কেয়ামতের কঠিন ময়দানে এই চোখই বান্দার বিরুদ্ধে আদালতের সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে! নিজের অজান্তেই শয়তানের বিষাক্ত তীরে হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে বাঁচতে নর-নারী নির্বিশেষে সকলেরই দৃষ্টি সংযত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন, প্রথমত মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি অবনত রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
“মুমিন পুরুষদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।” (সূরা আন-নূর: ৩০)
এরপরের আয়াতেই মহান আল্লাহ্ একইভাবে মুমিন নারীদেরকেও দৃষ্টি সংযত রাখার আকুল নির্দেশ প্রদান করেছেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
“আর মুমিন নারীদেরকেও বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে…” (সূরা আন-নূর: ৩১)
হারাম কোনো কিছুর দিকে তাকানোর ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্ক করে এর নাম দিয়েছেন চোখের জিনা:
الْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ
“চোখের জিনা হলো (হারাম বস্তুর দিকে) তাকানো।” (সহীহ বুখারী: ৬৬১২, সহীহ মুসলিম: ২৬৫)
দুনিয়াবি জীবনে চোখের গুনাহের ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক প্রভাব:
চোখ হলো মানুষের অন্তরের প্রবেশদ্বার। একজন পুরুষ বা নারী যা দেখে, তার গভীর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে তার হৃদয়ে। কুদৃষ্টি বা চোখের গুনাহ কেবল নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গের অপরাধ নয়, এটি মানুষের পুরো জীবনকে ধাপে ধাপে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
চোখের গুনাহ মানুষের দুনিয়াবি জীবনে সর্বপ্রথম যে ক্ষতিটি করে, তা হলো অন্তরের প্রশান্তি ও নূর কেড়ে নেওয়া। যে নারী বা পুরুষ চোখের গুনাহে লিপ্ত হয়, তার অন্তর থেকে ইবাদতের মিষ্টি অনুভূতি বা স্বাদ হারিয়ে যায়। সালাতে একাগ্রতা থাকে না, কুরআনের তিলাওয়াতে মন বসে না এবং সে ক্রমাগত মানসিক অস্থিরতা ও হতাশায় ভুগতে থাকে। দুনিয়াতে এই গুনাহের আরেকটি বড় শাস্তি হলো মেধা ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং রিযিকের বরকত কমে যাওয়া।
আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে চোখের গুনাহের ভয়াবহ পরিণতি:
আখেরাতের ময়দানে এই চোখের গুনাহ মানুষের জন্য চরম পস্তানি ও ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনবে। কারণ কেয়ামতের দিন মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার নিজের কৃতকর্মের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَىٰ أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
“আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, আর তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।” (সূরা ইয়াসীন: ৬৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন যে, চোখের জিনা মানুষকে ব্যভিচারের মতো বড় গুনাহের দিকে ধাবিত করে। কেয়ামতের দিন যখন কোনো অজুহাত কাজে আসবে না, তখন এই চোখই আল্লাহর দরবারে বান্দার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবে।
বর্তমান এ আধুনিক ধ্বংসাত্মক ডিজিটাল ফিতনাহ্ ফ্যাসাদের যুগে দৃষ্টির হেফাজত রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষের হাতে হাতে থাকা এ স্মার্টফোনটির অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহারের মাধ্যমে চরমভাবে ধসে পড়ছে সামাজিক নৈতিকতা।
আজকের আধুনিক যুগে মানুষের হাতের তালুতে থাকা স্মার্টফোনটি যোগাযোগের চমৎকার মাধ্যম হলেও, এর অপব্যবহার পুরো সমাজকে এক ভয়াবহ নৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার অসংযত ব্যবহারের ফলে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে অশ্লীলতা, পরকীয়া ও সামাজিক বেহায়াপনা। অতি গোপনে অনৈতিক কনটেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে প্রতিটি মানুষের কাছে, যা ধসে দিচ্ছে আমাদের ঈমানি চেতনা, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক পবিত্রতা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যে এই সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে:
শিশু-কিশোরদের মেধা বিনাশ: আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শিশুসুরক্ষা সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ অল্প বয়সেই অশালীন কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে। এতে তাদের মেধা বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে এবং অকালেই বিকৃত মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।
যুবসমাজের অবক্ষয়: গবেষণা সাময়িকী PLOS ONE ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুসারে, দেশের অধিকাংশ তরুণ ও যুবসমাজ মারাত্মক স্মার্টফোন আসক্তিতে ভুগছে। গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রিনে ডুবে থাকার কারণে তারা মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার।
পারিবারিক ফাটল ও সর্বজনীন আসক্তি: সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, স্মার্টফোনের মাধ্যমে অপসংস্কৃতি ও গোপন চ্যাটিংয়ের ব্যাধি কেবল তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ ও বৃদ্ধদের একাংশকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে অনৈতিক পথে। ফলে সমাজে বাড়ছে পরকীয়া, ভাঙছে দীর্ঘদিনের সংসার এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে পারিবারিক কলহ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ অনবরত স্ক্রিনে অশালীন দৃশ্য দেখার মাধ্যমে আমরা সেই হুকুম অমান্য করছি। ক্ষণস্থায়ী কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় নিজেদের মূল্যবান সময়, মানসিক শান্তি এবং চিরস্থায়ী আখেরাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছি।
প্রযুক্তির সঠিক ও কল্যাণকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের চোখের হেফাজত করা আজ সময়ের বড় দাবি। আসুন, সচেতন হই এবং ডিজিটাল এই মাধ্যমকে কেবল সৎ ও প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করার দৃঢ় সংকল্প করি। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে আল্লাহর আজাবের কথা স্বরণ করে সমস্ত প্রকার গুনাহ্ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন আমীন।
______________________
লেখকঃ বিশিষ্ট কলামিস্ট হুসাইন আল আজাদ ইবনে নোয়াব।
চেয়ারম্যানঃ MQ Global Foundation Bangladesh


























