
বিশেষ সম্পাদকীয় কলামঃ মুফতি মাহমুদুল হাসান।
আওয়ার টাইমস নিউজ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নৈতিক জাগরণের নাম। এটি কোনো একক দলের কর্মসূচি ছিল না, ছিল সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আর্তনাদ-ভয়, নিপীড়ন ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসী ঘোষণা। সেই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, তারা কেবল নিহত নন; তারা একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সাক্ষ্য। আজ আসন্ন গণভোটের প্রেক্ষাপটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের প্রশ্নটি তাই নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি সেই সাক্ষ্যের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার পরীক্ষা।
‘হ্যাঁ ভোট হেরে গেলে জুলাই বিপ্লবের শহীদরা হেরে যাবে’ এই কথার ভেতরে আবেগ আছে, কিন্তু আবেগের চেয়েও বেশি আছে ইতিহাসের বাস্তবতা। কারণ, গণআন্দোলনের অর্জন যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রূপ না পায়, তবে তা কাগজে-কলমে অস্বীকৃত থেকে যায়। অস্বীকৃতি মানে ঝুঁকি। ঝুঁকি মানে সেই মানুষগুলোর জন্য অনিশ্চয়তা, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তখন আইনের ভাষা, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং ক্ষমতার প্রয়োগ আবারও আন্দোলনের বিপরীতে ব্যবহৃত হতে পারে। এই আশঙ্কাই আমাদের সতর্ক করে।
আর যখন বলা হয়,‘বাংলাদেশ হেরে যাবে’ তখন সেটি আরও গভীর অর্থ বহন করে। এটি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার প্রশ্ন। ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংসদীয় সংস্কার, এসব যদি থেমে যায়, তবে রাষ্ট্র আবারও পুরোনো চক্রে আটকে পড়ে। তখন সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসে, মতপ্রকাশ সংকুচিত হয়, আর রাজনীতি মানুষের নিরাপত্তার বদলে মানুষের উদ্বেগে পরিণত হয়।
এই গণভোটের ‘হ্যাঁ’ মানে কেবল চারটি প্রস্তাবে সম্মতি নয়। ‘হ্যাঁ’ মানে পরিবর্তনের পথে এগোনোর সাহস। ‘হ্যাঁ’ মানে ক্ষমতাকে সীমার মধ্যে রাখা, প্রতিষ্ঠানকে শক্ত করা, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ‘হ্যাঁ’ মানে জুলাই সনদের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে আত্মত্যাগের মূল্য ইতিহাসে অটুট থাকে।
সমালোচনার জায়গা থাকতেই পারে। প্রশ্ন তোলাও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে জাতিকে ভাবতে হয় বড় ছবিটা। আজকের সিদ্ধান্ত আগামী দিনের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই মুখ্য। যদি আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ভিন্নমত অপরাধ নয়, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, যেখানে ক্ষমতা জবাবদিহির বাইরে নয়, তাহলে আমাদের সিদ্ধান্তও সেই লক্ষ্যের দিকে নিতে হবে।
এখানেই দেশের সচেতন নাগরিকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই গণভোট কোনো দলের প্রচারণা নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বের পরীক্ষা। যারা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল, জুলুম-নির্যাতনহীন একটি বাংলাদেশে জীবন যাপন করতে চান, তাদের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট কেবল পছন্দ নয়, এটি কর্তব্য। এটি সেই দায়িত্ব, যা আমরা শহীদদের প্রতি, নিজেদের প্রতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি বহন করি।
ভোটের দিনে দেওয়া প্রতিটি ‘হ্যাঁ’ একটি বার্তা বহন করবে, বাংলাদেশ আর পেছনে ফিরতে চায় না। বাংলাদেশ চায় শক্ত প্রতিষ্ঠান, ন্যায়ভিত্তিক শাসন এবং নাগরিকের মর্যাদা। এই বার্তা যত স্পষ্ট হবে, রাষ্ট্র ততই স্থিতিশীল হবে।
আজ আমরা একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সন্ধিক্ষণে নির্লিপ্ত থাকা মানে ইতিহাসকে নিজের মতো চলতে দেওয়া নয়; বরং ইতিহাসের ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি নেওয়া। তাই আসুন, সচেতন সিদ্ধান্ত নিই। আসুন, এমন একটি সিদ্ধান্ত নেই, যা আমাদের সন্তানদের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখাবে।
হ্যাঁ ভোটের বিজয় মানে কেবল একটি ফলাফল নয়, এটি মানে একটি নিরাপদ, শান্তিময় এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের পথে দৃঢ় অগ্রযাত্রা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ
লেখকঃ মুফতী মাহমুদুল হাসান চাদপুরী
বিশিষ্ট ইসলামিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

























