
আওয়ার টাইমস নিউজ।
স্পোর্টস ডেস্ক: ক্রীড়াঙ্গনকে বলা হয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে-ন্যায়, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যের প্রতীক। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সেই ধারণাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করেনি, বরং প্রমাণ করেছে, আজকের আইসিসি আর নিরপেক্ষ কোনো ক্রীড়া সংস্থা নয়; এটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত এক পক্ষপাতদুষ্ট ও নৈতিকতাহীন প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।
সম্প্রতি ভারতে বাংলাদেশি সন্দেহে এক মুসলিম যুবককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা উপমহাদেশজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি ভারতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মুসলিমবিদ্বেষ, উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ধারাবাহিক বাস্তবতারই অংশ।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যদি তাদের খেলোয়াড়, সমর্থক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে, তবে সেটি কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও ক্রীড়া বোর্ডের ন্যূনতম কর্তব্য।
বাংলাদেশ কোনো অযৌক্তিক দাবি তোলে না। বিসিবি স্পষ্টভাবে বিকল্প প্রস্তাব দেয়, ভারতের পরিবর্তে সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজন করা হোক।
প্রশ্ন হলো, খেলোয়াড়দের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই দাবিই কি অপরাধ?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার মূল্য কি তবে নিজের নাগরিকদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া?
আইসিসির জবাব ছিল নৈতিকভাবে ভয়াবহ। তারা বাংলাদেশের বাস্তব ও যুক্তিসংগত নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করে ভারতের অবস্থানকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়। ফলাফল-একটি পূর্ণ সদস্য দেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে কার্যত বাদ দেওয়া হয়, অথচ ক্রিকেটীয় যুক্তির বদলে অগ্রাধিকার পায় রাজনৈতিক আনুগত্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।
এই সিদ্ধান্তে আবারও স্পষ্ট হয়েছে-আইসিসির কাছে ন্যায়বিচার নয়, ভারতের বাজারমূল্যই শেষ কথা।
দর্শকসংখ্যা, সম্প্রচারস্বত্ব আর স্পনসরশিপ-এই তিন আর্থিক দেবতার সামনে আইসিসি দীর্ঘদিন ধরেই নতজানু। খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা, একটি দেশের মর্যাদা কিংবা ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতার বাস্তবতা-সবকিছুই সেখানে গৌণ।
একদিকে মুখে বলা হয় “Cricket for all”, অন্যদিকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা হয় এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের ইচ্ছাই নিয়ম।
এখানেই আইসিসির নির্লজ্জতা সবচেয়ে স্পষ্ট। একটি সার্বভৌম দেশের সরকার, ক্রীড়া বোর্ড ও জনগণের উদ্বেগকে তারা কার্যত অস্বীকার করেছে। এই আচরণ আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনে এক ধরনের ঔপনিবেশিক মানসিকতারই প্রতিফলন—যেখানে শক্তিশালীরা নির্দেশ দেয়, আর দুর্বলদের নীরবে মেনে নিতে হয়।
যদি একজন মুসলিম যুবকের নির্মম হত্যার পরও নিরাপত্তা প্রশ্ন উপেক্ষিত হয়, তবে আগামী দিনে কোন দল, কোন খেলোয়াড়, কোন জাতি নিরাপদ-এই প্রশ্ন থেকেই যায়। আইসিসির এই অবস্থান দেখিয়ে দেয়, প্রয়োজনে তারা মানবতার প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে টুর্নামেন্ট চালিয়ে যেতে দ্বিধা করবে না।
ইতিহাস এই সময়কে মনে রাখবে। মনে রাখবে, যখন একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা ন্যায়ের পাশে না দাঁড়িয়ে ক্ষমতার পায়ের কাছে মাথা নত করেছিল। এই সিদ্ধান্তে আইসিসির বহুদিনের মুখোশ সম্পূর্ণ খুলে গেছে।
ক্রিকেট টিকে থাকবে-কারণ ক্রিকেট মানুষের আবেগ, মানুষের ভালোবাসা।
কিন্তু আইসিসির মতো পক্ষপাতদুষ্ট ও চাটুকার প্রতিষ্ঠানের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে-একটি নৈতিক ব্যর্থতার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে।

























