
আওয়ার টাইমস নিউজ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিষধর সাপের উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চল থেকে বেজি নিয়ে গিয়েছিল জাপান। উদ্দেশ্য ছিল সাপ নিধন করে দ্বীপবাসীকে স্বস্তি দেওয়া। কিন্তু সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত উল্টো ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে।
জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপে দীর্ঘদিন ধরে বিষধর হাবু সাপের উপদ্রব ছিল। সাপের আতঙ্ক কমাতে কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে বেজিকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৯ সালে ওকিনাওয়া দ্বীপ থেকে প্রায় ৩০টি ছোট ভারতীয় বেজি আমামি ওশিমায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর এই বেজিগুলোর পূর্বপুরুষের সঙ্গে বাংলাদেশেরও যোগ রয়েছে।
১৯১০ সালে বর্তমান বাংলাদেশের গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল থেকে কয়েকটি বেজি জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানকার বংশবিস্তার করা বেজির মধ্য থেকেই আমামি ওশিমায় বেজি নেওয়া হয়।
সাপ মারার পরিকল্পনাই কেন হলো উল্টো?
পরিকল্পনায় ছিল বড় একটি ভুল। বেজি সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় হলেও হাবু সাপ মূলত রাতে শিকার করে। ফলে সাপ ও বেজির মধ্যে প্রত্যাশিত সংঘর্ষই খুব একটা ঘটেনি। সাপের সংখ্যা কমল না। বরং খাবারের সন্ধানে বেজি দ্বীপের স্থানীয় প্রাণীদের শিকার করতে শুরু করল।
দ্বীপটির বহু প্রাণী আগে বড় কোনো স্থলচর শিকারির মুখোমুখি হয়নি। ফলে বেজির মতো নতুন শিকারির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও ছিল দুর্বল। বিপন্ন হয়ে পড়ে বিরল প্রাণীরা বেজির আক্রমণে আমামি খরগোশ, মাটিতে বাসা বাঁধা পাখি, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ও স্থানীয় ব্যাঙসহ অনেক প্রাণী বিপদের মুখে পড়ে।
অল্প কয়েকটি বেজি থেকে দ্রুত বংশবিস্তার শুরু হয়। একপর্যায়ে দ্বীপে তাদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে যায় বলে ধারণা করা হয়।
যে প্রাণীকে সাপ মারার জন্য আনা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই প্রাণীই দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ৩১ বছর ধরে চলল বেজি নির্মূল অভিযান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পর জাপান সরকার বেজি নির্মূলের উদ্যোগ নেয়। ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় নির্মূল অভিযান।
পরে ২০০৫ সালে গঠন করা হয় বিশেষ দল ‘আমামি মঙ্গুজ বাস্টার্স’। দ্বীপজুড়ে হাজার হাজার ফাঁদ বসানো হয়। বেজির গতিবিধি শনাক্ত করতে ক্যামেরা এবং তাদের আস্তানা খুঁজতে প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করা হয়।
দীর্ঘ অভিযানে ৩২ হাজারের বেশি বেজি ধরা ও অপসারণ করা হয়।
অবশেষে মিলল সাফল্য প্রায় ৩১ বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে, আমামি ওশিমা থেকে ছোট ভারতীয় বেজি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে।
এরপর ধীরে ধীরে দ্বীপটির স্থানীয় প্রাণীদেরও ফিরে আসার লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে।
অর্থাৎ, সাপের উৎপাত ঠেকাতে যে বেজিকে আনা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই বেজিই হয়ে উঠেছিল দ্বীপটির প্রাণবৈচিত্র্যের অন্যতম বড় হুমকি। একটি ভুল পরিবেশগত সিদ্ধান্ত কীভাবে কয়েক দশক ধরে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে, আমামি ওশিমার এই ঘটনা তারই বিস্ময়কর উদাহরণ।































