
আওয়ার টাইমস নিউজ।
অর্থনীতি ডেস্ক: রমজান এলেই সামর্থ্যবান মুসলমানরা জাকাত আদায়ের প্রস্তুতি নেন। তবে এ বছর সেই হিসাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে স্বর্ণের দামে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জাকাতের নিসাব ও প্রদেয় অঙ্কে।
গত রমজানের পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি ট্রয় আউন্স প্রায় ২ হাজার ৯০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার ১০০ ডলারের ঘর ছুঁয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা গেছে দেশের বাজারেও। ফলে যাদের জাকাতযোগ্য সম্পদের বড় অংশ স্বর্ণভিত্তিক, তাদের জন্য জাকাতের হিসাব প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এক বছরে জাকাতে বাড়তি খরচ ২০ হাজার টাকার বেশি
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, গত বছর সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের জন্য যেখানে জাকাত দিতে হতো প্রায় ২৮ হাজার টাকা, সেখানে চলতি বছরে একই পরিমাণ স্বর্ণের জাকাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার ৮০০ টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে দুটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে ভরিপ্রতি দামের বড় লাফ।
নিসাব ও জাকাতের হিসাব কীভাবে বদলেছে
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, কারও কাছে যদি সাড়ে সাত ভরি বা প্রায় ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ এক পূর্ণ চন্দ্রবছর থাকে, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়। জাকাতের হার নির্ধারিত ২.৫ শতাংশ।
গত বছর দেশে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এক বছর পর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা। ফলে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের বাজারমূল্য ১১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৯ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
খাঁটি স্বর্ণ হিসাব করা জরুরি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গয়নায় ব্যবহৃত ২১ বা ২২ ক্যারেট স্বর্ণে সাধারণত কিছু খাদ বা মিশ্র ধাতু থাকে। তাই জাকাত হিসাবের ক্ষেত্রে খাঁটি স্বর্ণের পরিমাণ নির্ধারণ করে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী হিসাব করাই উত্তম।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নিয়মিত ব্যবহৃত গয়নাও যদি নিসাব পরিমাণে পৌঁছে এবং এক বছর থাকে, তাহলে সেটির ওপরও জাকাত প্রযোজ্য হয়।
স্ত্রীর স্বর্ণের জাকাত কার দায়িত্ব
ইসলামি গবেষক ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমদুল্লাহ বলেন, স্ত্রীর স্বর্ণ তার নিজস্ব সম্পদ। বিয়ে বা উপহার হিসেবে পাওয়া স্বর্ণের জাকাত আদায়ের দায়িত্ব স্ত্রীর ওপরই বর্তায়। স্বামী চাইলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে জাকাত দিতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে নিয়ত স্পষ্ট থাকা জরুরি।
স্বর্ণ না থাকলে কত টাকায় জাকাত ফরজ
স্বর্ণের বিকল্প হিসেবে রূপার নিসাবও গ্রহণযোগ্য। শরিয়াহ মতে, কারও কাছে যদি ৫৯৫ গ্রাম রূপা বা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ এক বছর ধরে থাকে, তবে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়।
বর্তমান বাজারদরে ৫৯৫ গ্রাম রূপার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার কিছু বেশি। ফলে দৈনন্দিন খরচ বাদ দিয়ে যদি এই পরিমাণ টাকা এক বছর সঞ্চিত থাকে, তাহলে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী মত দেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় রূপার নিসাব গ্রহণ করলে বেশি মানুষ জাকাতের আওতায় আসবে এবং দরিদ্ররা বেশি উপকৃত হবে।
স্বর্ণের দামের উল্লম্ফন ও সামাজিক প্রভাব
স্বর্ণের দাম বাড়ার ফলে নিসাবের সীমাও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-র এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছর স্বর্ণের ভিত্তিতে জাকাতের নিসাব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে যাদের সম্পদ আগের বছর নিসাব অতিক্রম করেছিল, তারা কেউ কেউ এখন সেই সীমার নিচে নেমে যেতে পারেন।
তবে যাদের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ বা সম্পদ রয়েছে, তাদের জাকাতের অঙ্ক বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে জাকাত আদায়ের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জাকাত বণ্টনে সতর্কতা জরুরি
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাকাত দেওয়ার আগে প্রকৃত হকদার যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিক দারিদ্র্য দেখে নয়, বরং কারও প্রকৃত আয়, সম্পদ ও প্রয়োজন বিবেচনা করেই জাকাত বণ্টন করা উচিত।
শায়খ আহমদুল্লাহর ভাষায়, জাকাত একটি আমানত। এটি সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করাই জাকাতদাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।




























