
আওয়ার টাইমস নিউজ।
নিজস্ব প্রতিবেদক: সমাজে প্রতিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষিত এবং আর্থিকভাবে প্রচণ্ড সচ্ছল সন্তান, সাধারণত এমন পরিবারের কথা উঠলে সবাই ভাবেন সেখানে বাবা-মায়ের শেষ জীবন হবে অত্যন্ত নিরাপদ, সুখের ও সম্মানজনক। কিন্তু উচ্চশিক্ষা আর সামাজিক মর্যাদার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক চরম নির্মম, অমানবিক ও বিবেকহীন বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে। এক নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটের আবর্জনায় ভরা কক্ষে প্রায় ৪-৫ দিন ধরে মরে পচে পড়েছিলেন এক বৃদ্ধা মা, অথচ খোঁজ নেননি সমাজে প্রতিষ্ঠিত তার কোনো উচ্চশিক্ষিত সন্তান! এই মর্মান্তিক ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে তথাকথিত শিক্ষিত অমানুষ সন্তানদের প্রতি সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও ধিক্কারের ঝড় বইছে।
গত রোববার (৩১ মে) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ প্রতিবেশীদের কল পেয়ে পল্লবী 6 নম্বর সেকশনের 8 নম্বর সড়কের একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগম (৭৫) নামে ওই বৃদ্ধার গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। সোমবার (১ জুন) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পল্লবী থানার ওসি হাসান জানান, বৃদ্ধা নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে তার মেয়ের বাসার একটি পরিত্যক্ত প্রায় কক্ষে চরম একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করছিলেন। কক্ষটি এতটাই আবর্জনায় ভরা ছিল যে, দেখে মনে হয়েছে গত কয়েক বছরে কেউ সেখানে প্রবেশই করেনি। মা মরে পচে দুর্গন্ধ ছুটলেও একই বাসায় থাকা মেয়ে নাকি কোনো গন্ধই পাননি! কথাবার্তায় অসংলগ্নতা থাকায় ময়নাতদন্তের পর বুয়েট শিক্ষক সন্তান মায়ের মরদেহ গ্রহণ করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হতভাগ্য সেই মায়ের সব সন্তানরাই দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে ডিগ্রিধারী এবং সমাজে অতি উচ্চপর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত।
বড় ছেলে সরকারের যুগ্মসচিব: বৃদ্ধার বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের একজন যুগ্মসচিব, যিনি বর্তমানে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ১৯৮৬ সালে এসএসসি ও ১৯৮৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি—উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম বিভাগ পান। এরপর ১৯৯৫ সালে বুয়েট (BUET) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত কেডিআই স্কুল থেকে এমপিপি ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সরকারের ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের উপ-পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও এই যুগ্মসচিব ছেলেটি একবারের জন্যও আসেননি।
মেঝ ছেলে বুয়েটের অধ্যাপক: দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম ashikur রহমান দেশের একজন অত্যন্ত খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও শিক্ষক। তিনি বর্তমানে বুয়েটের (BUET) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ক্যাডেট এবং ১৯৮৯ ও ১৯৯১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। বুয়েট থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
ছোট ছেলে ও মেয়ে: ছোট ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডায় উচ্চ বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন এবং একমাত্র কন্যা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত, যার ফ্ল্যাটেই অবহেলায় মারা যান এই মা।
ফেসবুক-ইউটিউবে তোলপাড়: রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কড়া অবস্থান
এই নির্মম ঘটনার পর থেকে ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। হাজার হাজার নেটিজেন ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিডিও এবং পোস্টের মাধ্যমে এই সন্তানদের তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছেন। তবে ঘটনাটি কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বৃদ্ধা মায়ের প্রতি এমন চরম অবহেলা ও অমানবিক আচরণের বিষয়টি এখন আইনি ও রাষ্ট্রীয় রূপ নিয়েছে।
বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার ভয়াবহতা এবং জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে রাষ্ট্র ও প্রশাসন এই সন্তানদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে যাচ্ছে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও সুরক্ষায় দেশের প্রচলিত ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সামাজিক মর্যাদা বা উচ্চ পদের দোহাই দিয়ে কোনো সন্তান যদি জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করে, তবে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি উচ্চ পদে থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মতো নৈতিক পেশায় জড়িত থেকে মায়ের পচা-গলা লাশ পড়ে থাকার এই ঘটনাকে চরম পেশাগত ও সামাজিক অসদাচরণ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো।
দেশজুড়ে ‘শিক্ষিত অমানুষ’ সন্তানদের প্রতি তীব্র ধিক্কার এই ঘটনার খবর গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, গোটা দেশজুড়ে মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের প্রশ্ন? যে শিক্ষা জন্মদাত্রী মায়ের পচা-গলা লাশের গন্ধ চিনতে শেখায় না, যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে কোটি টাকা আয় করলেও বৃদ্ধা মায়ের ঘরে ৫ মিনিটে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার সময় দেয় না, সেই শিক্ষাকে শিক্ষা বলা যায় না। নেটিজেনরা বলছেন, “ভালো ফলাফল বা বড় চাকরি করলেই যে মানুষ হওয়া যায় না, এই ঘটনা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।” শিক্ষা যদি মানুষকে দায়িত্বশীল, সংবেদনশীল ও মানবিক না করে, তবে সেই ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই।



























