
আওয়ার টাইমস নিউজ।
নিউজ ডেস্ক: রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ১২ বছরের ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুজন মাদক সেবনে বাধা দেওয়া এবং তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা দেখে ফেলায় হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে।
রোববার ভোরে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে আটক করা হয়। দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান শুরু করে তাদের আটক করে।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট শেষ রাতে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে বসে ওই দুই যুবক মাদক সেবন ও আড্ডা দিচ্ছিলেন। তারা নিয়মিত সেখানে মাদক সেবন করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন গণপতি চক্রবর্তী তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি দেখে ফেলেন। এরপর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা জানিয়েছেন।
শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বেরিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী বেরিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়।
সবশেষে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদের চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে তারা পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না এবং হত্যার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শনিবার রাতে পুলিশ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় বাড়ির ছাদে। তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছিল ছাদে ওঠার সিঁড়িতে। আর ছেলে আয়ুশের মরদেহ পাওয়া যায় খাটের নিচে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েকদিন ধরে বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে পরিবারের কাউকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। শনিবার রাতে বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়।
পরে পরিবারের স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা ভেঙে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় বাড়ির ভেতরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাতে সর্বশেষ তাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। শনিবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পরিবারের সবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এরপর তিনি স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে প্রধান ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। পরে জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯-এ ফোন করা হলে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু হয়।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। পরে রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে চিকিৎসাসেবা দিতেন। তার মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। মাস্টার্স শেষ করে তিনি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পরিবারটির সবচেয়ে ছোট সদস্য ১২ বছরের আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। একটি পরিবারের চার সদস্যকে এভাবে হত্যার ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মাদক সেবন, অপরাধ এবং পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে পুলিশের তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য বা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
সূত্র: রংপুর মহানগর পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য




























