
আওয়ার টাইমস নিউজ।
স্পোর্টস ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টের চতুর্থ দিনেই ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের এই জয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে দেশের দ্বিতীয় জয়। ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই তাদের হারিয়ে সেই ইতিহাসে যোগ হলো নতুন অধ্যায়। তাও আবার ম্যাচের হাতে একদিনেরও বেশি সময় থাকতেই ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
অস্ট্রেলিয়ার অল্পসংখ্যক সমর্থক ম্যাচের চতুর্থ দিনে দুবার হাততালি দিয়েছিলেন। প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড পেরিয়ে ইনিংস হার এড়ানোর পর। দ্বিতীয়বার হাততালি আসে ক্যামেরন গ্রিনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পর। কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাট করে গ্রিন ১০৪ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেছেন। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসগড়া জয়ের সামনে তাঁর এই সেঞ্চুরি শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকে শুধুই সান্ত্বনা। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের লেখা নতুন ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার ওই দুটি মুহূর্ত বড়জোর পাদটীকা হয়ে থাকল। কারণ ম্যাচের শেষ হাসি হেসেছে বাংলাদেশই।
বাংলাদেশের ডারউইন জয়ের ভিত্তি মূলত তৈরি হয়েছিল টেস্টের প্রথম তিন দিনেই। তৃতীয় দিনের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে চাপ তৈরি হওয়ার পর চতুর্থ দিনে এসে সেই চাপকে জয়ে পরিণত করে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৪২৬ রান সংগ্রহ করে। জবাবে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। ফলে প্রথম ইনিংসেই ২২৮ রানের বড় লিড পায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস হার এড়ালেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামনে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দিতে সক্ষম হয়।
চতুর্থ দিনের সকালের উইকেট থেকে মেহেদী হাসান মিরাজ দারুণ টার্ন ও বাউন্স আদায় করে নেন। তাঁর ঘূর্ণির সামনে অস্ট্রেলিয়ার নিচের সারির ব্যাটসম্যানরা খুব বেশি সময় টিকতে পারেননি। ইনিংসের ৬০তম ওভারে মিরাজের বাঁক নেওয়া একটি বল লাফিয়ে উঠে ব্যাটের কানায় লাগে এবং কট বিহাইন্ডে ক্যাচ হয়। এরপর ৬৬তম ওভারে বো ওয়েবস্টারকে ফিরিয়ে দেন তিনি। ৭৪তম ওভারে প্যাট কামিন্স এবং ৯৬তম ওভারে শেষ ব্যাটসম্যান নাথান লায়নকেও সাজঘরে ফেরান মিরাজ। সব মিলিয়ে ৬৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৫তম বারের মতো পাঁচ উইকেটের কীর্তি গড়েন তিনি।
লাঞ্চ বিরতিতে নিজের বোলিং নিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, তিনি সহজভাবে সবকিছু করার চেষ্টা করেছেন। অফ স্টাম্পের বাইরের উইকেটে থাকা ফুটমার্কস কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রতিটি ওভারে উইকেট নেওয়ার জন্য মরিয়া না হয়ে শৃঙ্খলা ধরে রাখাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন মিরাজ। তাঁর সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত কাজে দিয়েছে। লাঞ্চের পরও একই শৃঙ্খলা ধরে রেখে বোলিং করেন তিনি। তবে শতরান করা ক্যামেরন গ্রিনের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটি নেন প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট পাওয়া পেসার হাসান মাহমুদ।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে মিরাজ নেন ৫ উইকেট। হাসান মাহমুদ নেন ৩ উইকেট। তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম নেন একটি করে উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে হাসান মাহমুদ একাই অস্ট্রেলিয়ার ৯টি উইকেট তুলে নেন। চতুর্থ দিনের লড়াইয়ে লাঞ্চের আগেই অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা অনেকটা নাজুক হয়ে যায়। দিনের খেলা শুরু করার সময় বাংলাদেশের ৪২৬ রানের স্কোর থেকে ৬৭ রান পিছিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। হাতে ছিল ৬ উইকেট, কিন্তু প্রথম সেশনেই তিন উইকেট হারিয়ে বসে স্বাগতিকরা।
প্রথম সেশনে ৩১ ওভার ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেট হারায়। তিনটি উইকেটই তুলে নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে মিরাজের ঘূর্ণির মধ্যেও অস্ট্রেলিয়া প্রথম সেশনে ৮২ রান সংগ্রহ করে। এর ফলে ইনিংস হার এড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে তারা। লাঞ্চে যাওয়ার সময় অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ২৪৩ রান। বাংলাদেশের বিপক্ষে তখন তাদের লিড দাঁড়ায় ১৫ রানে এবং হাতে ছিল মাত্র ৩ উইকেট। কিন্তু লাঞ্চের পর আর বেশি সময় প্রতিরোধ গড়তে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।
লাঞ্চের পর মাত্র ১১.১ ওভারের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার বাকি ব্যাটসম্যানরা সাজঘরে ফিরে যান। এর মধ্যেই ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের ইনিংস শেষ হয়। তাঁর সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস পরাজয় থেকে বাঁচালেও ম্যাচে জয়ের জন্য যথেষ্ট রান এনে দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ৫৭ রান। সেই লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি কঠিন হয়ে ওঠেনি। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান দ্বিতীয় ওভারেই জশ হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে ফিরলেও এরপর আর কোনো বিপদ হয়নি।
আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম ও অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুমিনুল হক মিলে জয়ের বাকি পথ সহজ করে দেন। সাদমান ইসলাম অপরাজিত থাকেন ২৫ রানে। মুমিনুল হক অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে। ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন মুমিনুল। এরপরই ডারউইনের গ্যালারি জুড়ে শুরু হয় বাংলাদেশ বাংলাদেশ স্লোগান। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি সমর্থকদের উল্লাসে কিছু সময়ের জন্য মারারা স্টেডিয়াম যেন বাংলাদেশের ঘরের মাঠে পরিণত হয়। ড্রেসিংরুমের সামনে ক্রিকেটাররা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ ও আবেগে ভেসে যান।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুম থেকে প্রেসবক্স পর্যন্ত নেমে আসে নীরবতা। ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল বুঝতে পেরে চতুর্থ দিন ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও খুব অল্পসংখ্যক অস্ট্রেলীয় দর্শক মাঠে এসেছিলেন। আগের তিন দিনের তুলনায় গ্যালারি ছিল প্রায় ফাঁকা। স্টেডিয়ামের বাইরে এবং ভেতরেও আগের মতো উৎসবের পরিবেশ দেখা যায়নি। এমনকি মারারা স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জও পুরোপুরি ফাঁকা ছিল। যেখানে টেস্টের অন্য দিনগুলোতে সাবেক ক্রিকেটার, ক্রিকেট কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জমজমাট পরিবেশ থাকত, সেদিন সেখানে ছিল না কোনো আয়োজন।
লাউঞ্জে সাধারণত সারাদিনের জন্য বুফে খাবার ও বিভিন্ন ধরনের পানীয়ের ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু চতুর্থ দিনে সেখানে কোনো খাবারের টেবিলও বসানো হয়নি। লাউঞ্জের এক কর্মী জানান, তৃতীয় দিনের পর আর টেস্ট গড়াবে না ধরে নিয়ে চতুর্থ দিনের জন্য কেউ প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জের টিকিট কাটেননি। পরে টেস্ট চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে নতুন করে টিকিট বিক্রিও হয়নি। তাই স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল, চতুর্থ দিনে লাউঞ্জটি বন্ধ থাকবে। মাঠের খেলা অস্ট্রেলিয়া টেনে চতুর্থ দিন পর্যন্ত নিতে পারলেও ডারউইনের অনেক মানুষ যেন তৃতীয় দিন শেষেই পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন।
এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় জয়। ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে তাঁর ৬ উইকেট এবং দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ৩ উইকেট বাংলাদেশকে বড় জয় এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মেহেদী হাসান মিরাজের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেটও জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। সব মিলিয়ে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে দারুণ পারফরম্যান্স করে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে স্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রান করেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন সর্বোচ্চ ১০৪ রান করেন। স্টিভ স্মিথ করেন ৪৪, মার্নাস লাবুশেন ৩১, অ্যালেক্স ক্যারি ৩০, মিচেল স্টার্ক ১৮ এবং নাথান লায়ন ১৫ রান করেন। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে মেহেদী হাসান মিরাজ ৫ উইকেট, হাসান মাহমুদ ৩ উইকেট, তাসকিন আহমেদ ১ উইকেট ও তাইজুল ইসলাম ১ উইকেট নেন। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১ উইকেট হারিয়ে ৫৭ রান তুলে ৯ উইকেটে জয় নিশ্চিত করে।































