
আওয়ার টাইমস নিউজ।
নিউজ ডেস্ক: গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিবেকের নাড়া লেগেছে। রাজধানীর উত্তরা এলাকার একটি বাসায় মাত্র ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বিথী, এবং তাদের বাসার আরও দুই গৃহকর্মী।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শিশুটিকে গৃহকর্মীর কাজ করানোর নামে ওই বাসায় রাখা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার করা হয়। শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন, দগ্ধ হওয়ার ক্ষত এবং চরম আতঙ্কের আলামত দেখে বিষয়টি সামনে আসে। পরে শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে গণমাধ্যম জানায়, মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা হয়েছে। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত অভিযুক্তদের জামিন আবেদন নাকচ করে চারজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিচয় অনুযায়ী, মোহাম্মদ শফিকুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কর্মরত। তিনি প্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগ পান। সংবাদ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ রয়েছে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি।
এখানেই সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি উঠে আসে। যে মানুষটি শিক্ষিত, যিনি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের দায়িত্বে আছেন, তার বাসায় কীভাবে একটি শিশু এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়? শিক্ষা, পদ, মর্যাদা-কোনোটিই কি একটি শিশুর কান্না থামাতে পারেনি?
গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটিকে শুধু মারধর নয়, ভয়ভীতি দেখানো, দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে রাখা এবং শারীরিকভাবে নিপীড়নের শিকার করা হয়েছে। শিশুটি ছিল সম্পূর্ণ অসহায়। তার পক্ষে কথা বলার কেউ ছিল না। সেই অসহায়ত্বকেই যেন পুঁজি করে চলেছে এই নিষ্ঠুরতা।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একা মানুষকে মানুষ বানায় না। শিক্ষা যদি মানবিকতা, সহানুভূতি আর দায়িত্ববোধ না শেখায়, তাহলে সেই শিক্ষাই সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ অজ্ঞ ছিল। আজ মানুষ শিক্ষিত, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিষ্ঠুরতা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি আমাদের সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে ক্ষমতা ও অবস্থানের আড়ালে দুর্বলদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। যেখানে একটি শিশুর কান্না শোনা যায় না, যদি না সে রক্তাক্ত হয়ে দরজার বাইরে আসে।
আজ এই শিশুটি বেঁচে আছে বলেই আমরা তার গল্প জানতে পারছি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-কত শিশু এখনো নীরবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যাদের গল্প কখনো আলোয় আসে না?
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই ঘটনাটি আমাদের জন্য শুধু একটি সংবাদ নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। একটি সমাজ হিসেবে আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর আয়না। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের— আমরা কি শুধু খবর পড়ব, নাকি সত্যিই এমন মুখোশধারী শিক্ষিত নরপিচাশদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব?
একটি সমাজের সভ্যতা পরিমাপ হয় সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তা দিয়ে। আজ সেই পরীক্ষায় আমরা সবাই দাঁড়িয়ে আছি।





























